বর্তমান অবস্থান জন্য কে দাবী? আস্তিক নাস্তিক ক্যাচাল বন্ধ হোক

ধর্মের মূল ভিত্তি যেহেতু বিশ্বাস সেহেতু বিশ্বাস কি তা জেনে নিই-

বিশ্বাস কাকে বলে? আমরা কি বলি আমরা পিঁপড়ায় বিশ্বাস করি, সাপে বিশ্বাস করি, জলে বিশ্বাস করি, বা বজ্রপাতে, বা পদ্মানদীতে বিশ্বাস করি? এসব, এবং এমন বহু ব্যাপারে বিশ্বাসের কথা ওঠে না, কেননা এগুলো বাস্তব সত্য বা প্রমাণিত। যা সত্য, যা প্রমাণিত, যা সম্পর্কে কোনও সন্দেহ নেই, তাতে বিশ্বাস করতে হয় না; কেউ আমরা বলি না যে আমি বিদ্যুতে বিশ্বাস করি, বা রোদে বিশ্বাস করি, বা গাড়িতে বিশ্বাস করি, কেননা সত্য বা প্রমাণ।

প্রতি ব্যাপারে বিশ্বাস করতে হয় না, বিশ্বাস করতে হয় অসত্য, অপ্রমাণিত, সন্দেহজনক বিষয়ে। অসত্য, অপ্রমাণিত, কল্পিত ব্যাপারে আস্থা পোষণই হচ্ছে বিশ্বাস। “বিশ্বাস কর” ক্রিয়াটি নিশ্চয়তা বোঝায় না, বোঝায় সন্দেহ; আর এ-ক্রিয়ার অকর্তা-পদে দু-রকম বিভক্তি হয়, এবং বাক্যের অর্থ বিস্ময়কর ভাবে বদলে যায়। আমি বলতে পারি “আমি ঈশ্বরে বিশ্বাস করি, কিন্তু ঈশ্বরকে বিশ্বাস করি না”। এ-বাক্যে প্রথম ঈশ্বর অধিকরণ কারক, এতে বসেছে ‘এ’ বিভক্তি; আর দ্বিতীয় ঈশ্বর কর্মকারক, এতে বসেছে ‘কে’ বিভক্তি; এবং বাক্যটি বোঝাচ্ছে ঈশ্বরের অস্তিত্বে বিশ্বাস করলেও আমি তার ক্রিয়াকলাপ সম্পর্কে সন্দেহ পোষণ করি। বাঙলায় কিছুর অস্তিত্বে বিশ্বাস করার জন্য অধিকরণে সপ্তমী বিভক্তি হয়। বিশ্বাস নিশ্চয়তা বোঝায় না, সন্দেহই বেশি বোঝায়; তবে বিশ্বাসীদের স্বভাব ভাষার স্বভাবের বিপরীত; -ভাষা যেখানে বোঝায় অনিশ্চয়তা, বিশ্বাসীরা সেখানে বোঝেন নিশ্চয়তা। মানুষের বিশ্বাসের শেষ নেই, কোটি কোটি বিশ্বাস পোষণ করে মানুষ। এমন মনে করার কোনও কারণ নেই যে এখন যেসব বিশ্বাস চলছে, সেগুলো চিরকাল ধ’রে চলছে; এখনকার বিশ্বাসগুলোর বয়স খুব বেশি নয়, এগুলোর আগে লাখ লাখ বিশ্বাসের উদ্ভব ও বিনাশ ঘটেছে; দেবতা বা ঈশ্বর বা বিধাতা বা কোনও বিশেষ স্রষ্টায় বিশ্বাস সেদিনের, চার-পাঁচ হাজার বছরের, কথা; মানুষের বয়স তাদের বিভিন্ন দেবতা বা বিধাতাদের বয়সের থেকে অনেক বেশি।

-হুমায়ুন আজাদ

ব্লগারদের লিস্ট বাহির হওয়ার পর একটি বিষয় খুব ভাল ভাবে লক্ষ্য করছি তা হল; অনেকেই বলছে চাচ্ছেন; বর্তমান এই আস্তিক নাস্তিকের ক্যাচাল ও সংকটের জন্য নাস্তিকরা দায়ী। তারা আরও বলছে; নাস্তিকরা যদি চুলকানি মূলক পোস্ট না দিত তাহলে বর্তমান এই পরিস্থিতির সৃষ্টি হতো না। দেখতে হবে কথাটার সত্যতা ও বাস্তবতা কতোটুকু এবং এরই সাথে সাথে দেখতে হবে আসলে নাস্তিকতার পোস্টের বিষয় কি।
ধার্মিকদের সুরে সুর মিলিয়েই বলতে হবে; কিছু ধার্মিকের জন্য যেমন সব ধার্মিকে দোষারোপ করা অন্যায় ঠিক এক দুইজন নাস্তিককে দেখে সকল নাস্তিককে বিচার করাও অন্যায়। কথা হল নাস্তিকরা কি বর্তমান পরিস্থিতির জন্য দায়ী?

ব্লগে সব মানুষ যে সৃষ্টিশীল লেখক তা ভাবাটা বোকামি। এখানে কেউ ইতিহাস লিখতে পছন্দর করে, কেউ সামাজিক ও অর্থনৈতিক সংকট নিয়ে, কেউ বা ধর্ম ও বিজ্ঞানের সম্পর্ক নিয়ে এবং কেউ কেউ ধর্মের অমৃত বাণী ও কাহিনী পোস্ট করে থাকে। এখন কথা হল কেউ যেমন ধর্মের অমৃত বাণী ও কাহিনী পোস্ট করার অধিকার রাখে তেমনি সবাই অধিকার রাখে ধর্মের ঐ কাহিনীর আলোকে তৎকালীন সমাজ-বাস্তবতার পর্যালোচনা টাইপ পোস্ট আবার সবাই অধিকার রাখে আবার ব্লগাররা অধিকার রাখে ধর্ম কতোটুকু বিজ্ঞান সম্মত বা ধর্মের ঐ কাহিনী কতোটুকু বিশ্বাস যোগ্য!!!
এখন সবাই বলবেন ভাই চলে তো আসলেন সেই ধর্ম অবমাননার চ্যাপ্টারে। আসলে ধর্ম অবমাননা কি তা আমার কাছে পরিষ্কার না। কোন ব্লগার যদি “ধর্ম ও বিজ্ঞান একি জিনিস” দাবী করে ব্লগ পোস্ট করতে পারে তাহলে অন্য ব্লগাররা কেন পারবে না “বিজ্ঞান ও ধর্ম বিপরীতমুখী” তা দাবী করে পোস্ট? এখন কথা হচ্ছে ধর্ম বিজ্ঞান এক করে পোস্টটি কোন দোষে দুষ্টু না হলেও “বিজ্ঞান ও ধর্ম বিপরীতমুখী” এ কথা বলা হলেই ধর্ম অবমাননার দোহাই দেওয়া হয়। তাহলে আমার প্রশ্ন ধর্ম যা খুশি তা করার অধিকার রাখলেও ধর্মের বিপক্ষে যুক্তিনির্ভর কোন কথাই কি কেউ বলতে পারবে না?

মনে করিয়ে দিই; বছর খানিক আগে “দৈনিক কালের কণ্ঠ” পত্রিকায় শুক্রবারে একটি লেখা ছাপানো হয়। সেখানে লেখব দাবী করছে- আপেক্ষিক তত্ত্ব থেকে শুরু করে মধ্যাকার্যন শক্তি, বিবর্তনবাদ সবকিছু কোরান থেকে বিজ্ঞানীরা চুরি করেছে। লেখাটির শিরোনাম- আধুনিক জ্ঞান-বিজ্ঞানের উৎস-গ্রন্থ আল কোরআন

এই লেখাটি পড়ে আমার বিজ্ঞাননুভূতিতে চরম আঘাত লাগে। লেখক সকল বিজ্ঞানীদের রীতিমতো চোর বানিয়ে ছেড়েছেন। এখন যদি আমি ঐ লেখার প্রতিবাদে যদি আমি লিখি তাহলে অবশ্যই আমাকে ধর্ম ও ধর্মের মধ্যে বিজ্ঞান কতোটুকু তা নিয়ে আলোচনা করতে হবে। এখন কথা হচ্ছে ওটা লিখলেও তো আপনাদের ধর্মানুভূতিতে আঘাত আসবে তাই নয় কি? বিজ্ঞানমনস্ক লেখক অভিজিৎ রায় একটি লেখা লিখেছেন “ বিজ্ঞানময় কিতাব ”

অভিজিৎ রায়ের লেখা পড়ে অনেকেরই ধর্মানুভূতিতে আঘাত আসতে পারে। কথা হচ্ছে কেউ যদি ধর্মে বিজ্ঞান খুঁজতে পারে তাহলে আমি কেন পারব না ধর্মের মধ্যে বিজ্ঞান নেই তা বলতে? যদি আমার অধিকার না থাকে ধর্মের মধ্যে বিজ্ঞান নেই তা বলার তাহলে তো রাষ্ট্র ও সমাজ আমার চিন্তা রোধ করে দিতে চাচ্ছে। এক সময় ছাত্র ইউনিয়নের একটা স্লোগান ছিল।  “ধর্ম যার যার কাছে রাষ্ট্রের কি করার আছে”
কিন্তু বর্তমানে প্রেক্ষিতে বলা যাবে আসলে ধর্ম আজ আর ব্যক্তি কেন্দ্রিক নেই বরং রাষ্ট্র কেন্দ্রিক হয়ে গেছে। রাষ্ট্র মানুষের ধর্মের নিয়ন্ত্রণ নিতে চাচ্ছে। উপরের কথা অনুযায়ী কী বুঝলেন; ধর্ম-অবমাননা জিনিসটি আসলে কী এবং কী রূপ তা নির্ণয় করা দূরহ ব্যাপার তাই নয় কী?

এবার আসি কিছু উগ্র নাস্তিক ও আস্তিকের প্রসঙ্গে। আস্তিকতা উগ্র হলেও ক্ষতি নেই কিন্তু আমাদের সমাজে নাস্তিকতা উগ্র হলে মেলা সমস্যা। এক নাস্তিকের জন্য সকল নাস্তিকদের দুর্নাম কুড়াতে হয়। হ্যাঁ স্বীকার করি কিছু কিছু নাস্তিক আছে যারা ধর্মের সমালোচনা না করে বরং ব্যঙ্গ করে বা গালাগালি করতেই বেশি সুখ অনুভব করে। কিন্তু কথা হচ্ছে অপর দিতে অতি আস্তিক কী করছে; সে ঐ ব্লগারের মাকে বোনকে নিয়ে গালাগালি করছে কথা হল দুইজনই তো উগ্র। তিনিও হয়তো গালি খেয়ে পাল্টা গালি দিচ্ছেন। তাই সব নাস্তিককে বা সব আস্তিককে এক পাল্লায় মাপা ভুল।

এবার আসি অতি আস্তিকের প্রসঙ্গে। এই প্রজাতির লোক আমাকেও গালাগালি করবে যখন আমি দেখব ধর্মের সাথে বিজ্ঞানের কোন সম্পর্ক নেই অথবা কালের কণ্ঠ পত্রিকার লেখার বিপরীতে যখন একটা লেখা দেব। অতি আস্তিক প্রজাতির মানুষ গুলো ধর্মের “ধ” শোনার সাথে সাথে গালাগালি শুরু করে দেয়। তাদের কাছে একটাই কথা এটাই দাবী; ধর্মের সমালোচনা করা যাবে না।

এখন কথা হচ্ছে, কিছু ঘরোয়া আস্তিক (ধার্মিক আর আস্তিক এক জিনিস না) নাস্তিকদের দোষ দিয়েই বর্তমান সংকটের দায় এড়াতে চান। আমার কথা হল যখন ঐ উগ্র নাস্তিক পোস্ট দিল তখন কী আপনি তাকে একটু বুঝিয়েছেন যে; ভাই আপনার এরকম পোস্ট অনেককে আহত করবে এমন পোস্ট না দেওয়া উচিত অথবা যে গালাগালি করছে তাকে বোঝান আপনার এমন ব্যবহারে ঐ লোকটি আরও আক্রমণাত্মক পোস্ট দেবে। তাই আজকের এই পরিস্থিতির দোষ কারো ঘাড়ে দিয়ে নিজে দায় মুক্তি হওয়ার সুযোগ নেই।

একটা কথা সবাই জানেন;- সূর্য পৃথিবীর চার দিকে ঘোরে নাকি পৃথিবী সূর্যের চার দিকে ঘোরে তা নিয়েও কিন্তু ধর্মানুভূতি এবং এর জন্য হত্যা, নির্যাতন কম হয় নি। ব্রুনো কে আগুনে পুড়তে হয়েছিল, বুড়ো গ্যালেলিওকে নির্যাতন সহ্য করতে হয়েছিল। তাই ধর্মানুভতি নিয়ে যুক্তিতর্ক করা রীতি মতন হাস্যকর মনে হয়। আমরা দাবী করতে পারি বস্তু নিষ্ঠ আলোচনা হোক। আর নাস্তিকদের বলতে চাই ধর্মের বস্তুনিষ্ঠ আলোচনা না করে গালাগালি বা ফালতু কথা লিখলে মানুষ থেকে শুধু ঘৃণা-ই অর্জন করবেন। তাই আমাদের সকলে উচিত আরও দায়িত্বশীল হওয়া।

হ্যাঁ; আমি মানি; মানুষ ধর্মের সমালোচনা হওয়ার রাইট সবাই রাখে। ধর্ম করার রাইটও সবাই রাখে। ধর্মানুভূতি কী তা ভাল মতন জানার জন্য হুমায়ুন আজাদ স্যারের ধর্মানুভূতির উপকথা পড়তে পারেন। লিংক- ধর্মানুভূতির উপকথা আর যদি আমরা বর্তমান পরিস্থিতির লাগাম টেনে না ধরি তাহলে কয়েক দিনের মধ্যেই শুধু নাস্তিক না সকল প্রতিবাদী ও মুক্তচিন্তার ব্লগার অবস্থা হবে নিচের ছবির মতন। তাই সময় থাকতে সাধু সাবধান হোন সবাই।

জানুয়ারি ৪, ২০১৩

Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s