ছয় দফা, স্বাধীনতা, পাহাড়ের কান্না ও চাকমা সম্প্রদায়

birishiri

এর আগে মুক্তিযুদ্ধে আদিবাসীদের ভূমিকা নিয়ে লিখেছিলাম। সেখানে একাত্তরে চাকমাদের অবদানের কথাও ক্ষুদ্র আকারে উপস্থাপিত হয়। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশে ৪৫টি নৃ-গোষ্ঠী ছিল। এর মধ্যে জনসংখ্যার বিচারে বৃহৎ গোষ্ঠীটি হল চাকমা গোষ্ঠী। ১৯৭০ সালের ৯ ডিসেম্বর সামরিক প্রহরায় অনুষ্ঠিত হয়েছিলো সত্তরের সাধারণ নির্বাচন। পূর্ব বাংলার ১৬৯টি আসনের মধ্যে আওয়ামী লীগ জয় লাভ করে ১৬৭টি আসন। অন্যদিকে পিডিবি থেকে প্রার্থী হয়ে নুরুল আমিন ও স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে জয় পায় চাকমা রাজা ত্রিদিব রায়। অন্য রাজনৈতিক দলগুলো পূর্ব পাকিস্তান থেকে কোন আসল লাভ করতে পারে নি। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব ত্রিদিব রায়কে আওয়ামী লীগ থেকে নির্বাচন করার প্রস্তাব করেন। কিন্তু তিনি তাতে রাজি না হয়ে স্বতন্ত্রভাবে নির্বাচন করেন।

১৯৪৭ সালে দেশ ভাগের প্রধান শর্ত ছিল- মুসলিম অধ্যুষিত অঞ্চল নিয়ে পাকিস্তান এবং অমুসলিম অধ্যুষিত অঞ্চল নিয়ে ভারত গঠন হবে। স্বভাবতই আদিবাসী প্রধান পার্বত্য চট্টগ্রামের অন্তর্ভুক্তির সম্ভাবনা ছিল ভারতের সাথে। দেশ বিভাগের তিন দিন পরেও পার্বত্য চট্টগ্রামে ভারতীয় পতাকা উড়ে। পার্বত্য চট্টগ্রামকে ভারতের সাথে যোগ করার জন্য চাকমা নেতারা দিল্লি গিয়ে কংগ্রেসকে বিশেষভাবে অনুরোধ করে আসেন। কিন্তু রাজনৈতিক সমীকরণে পার্বত্য চট্টগ্রাম শেষ পর্যন্ত পাকিস্তানের সাথে যুক্ত হয়। ২১ আগস্ট পাকিস্তানের বেলুচ রেজিমেন্ট রাঙামাটিতে ভারতের পতাকা নামিয়ে পাকিস্তানের পতাকা উত্তোলন করে। একইভাবে বান্দরবানেও বার্মার পতাকা উড়েছিল যা পরবর্তীতে নামিয়ে ফেলা হয়। ভারত ও বার্মার পতাকা উত্তোলনের ঘটনা পাকিস্তানি শাসকদের ক্ষুব্ধ করে। পাকিস্তান জন্মের শুরু থেকে তাদের ধারণা জন্মায় যে পাহাড়িরা পাকিস্তান বিরোধী।

পাকিস্তান আমলে পূর্ব পাকিস্তানের বৃহৎ শোষিতদের বড় অংশ ছিল বাঙালি। শোষণের বিরুদ্ধে বাঙালির প্রথম প্রতিবাদ করে ৫২-এর ভাষা আন্দোলনের মধ্য দিয়ে। ‘রাষ্ট্র ভাষা বাংলা চাই’ এটাই ছিল আমাদের স্লোগান। একাত্তরে বাঙালি, অবাঙালি সমানভাবে যুদ্ধ করলেও মূল লড়াইটা শুরু হয় বাঙালি জাতীয়তাবাদী আন্দোলন থেকে। বাঙালি জাতীয়তাবাদী আন্দোলন শুরু হয় ৫২-এর ভাষা আন্দোলনের মধ্য দিয়ে। এবং ছয় দফাকে স্পষ্ট করে বলাই হয়; ছয় দফা বাঙালি জাতির মুক্তির সনদ। অর্থাৎ বাঙালি জাতির আর্থ-সামাজিক সকল মুক্তি বা দাবী দাওয়া ছয় দফার মাধ্যমে উপস্থাপিত হয়। ফলে স্বাভাবিকভাবে সংখ্যালঘু অবাঙালীদের স্বার্থ সেখানে গৌণ হিসেবে ছিল। এখানে ত্রিদিব রায়ের ছেলে দেবাশীষ রায়ের বক্তব্য গুরুত্বপূর্ণ মনে হয়েছে। তিনি বলছেন- “My father was forced to collaborate with Pakistan. His view was-we are a small nation. We can’t take on Pakistan, but Bengalis can. And yet, we were not part of the Bangladesh plan. The Six-point Plan was all about Bengalis, and there was nothing about Chakmas in it. In March 71, who knew the future?

পাকিস্তান সেনা বাহিনী পার্বত্য চট্টগ্রামে অপারেশন চালাবে না! এমন আশ্বাসের ভিত্তিতে ত্রিদিব রায় পাকিস্তানকে সাপোর্ট দিতে শুরু করে। ত্রিদিব রায় পাকিস্তান সাপোর্ট করলেও পাকিস্তান তাদের ধ্বংস-যজ্ঞ ও হত্যা থেকে পার্বত্য চট্টগ্রামকে রেহাই দেয় নি। অদ্ভুত বিষয় হল ত্রিদিব রায় পাকিস্তান সাপোর্ট দিতে থাকে এবং বাকি জীবন পাকিস্তানে থেকে মৃত্যু বরণ করে। চাকমা রাজা ত্রিদিব রায় পাকিস্তানিদের পক্ষ নিলেও চাকমা রাজপরিবারের অন্যতম সদস্য কে. কে রায়ের মুক্তিযুদ্ধে সহায়তা ও সর্বাত্মক সহযোগিতা করেছিলেন। এছাড়াও শেখ মুজিবের ৭ই মার্চ ভাষণে অনুপ্রাণিত হয়ে মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেওয়ার সংকল্পবদ্ধ হন রসময় চাকমা। কিন্তু কোন এক অজ্ঞাত কারণে ভারতে প্রশিক্ষণ নিতে গেলে তাকে বাদ দেওয়া হয়। কিন্তু তাতেও তিনি দমে যান নি। দেশে ফিরে এসে খাগড়াছড়ির এক পাঞ্জাবির বাড়িতে তিনি আগুন জ্বালিয়ে দেন। এছাড়াও অনেক চাকমা জিয়াউর রহমানের জেড ফোর্সকে নিরাপদে ফেনী নদী পার হতে সাহায্য করে। চাকমাদের থেকে অভিযোগ করা হয়; মুক্তিযুদ্ধে অনুপ্রাণিত হয়ে অনেক তরুণ, যুবক ও সাধারণ মানুষ যোগ দিতে চাইলেও তৎকালীন সময়ে চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক ও স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা চাকমাদের অবিশ্বাস করে মুক্তিযুদ্ধে অংশ থেকে দূরে রাখে। সম্ভবত অবিশ্বাস চাকমা রাজা ত্রিদিব রায়ের কারণেই জন্ম নেয়। আদিবাসীদের পাকিস্তানীদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার একটাই কারণ ছিল; তারা ভেবেছে বাংলাদেশ স্বাধীন হলে তারাও স্বাধীনভাবে বসবাস করতে পারবে। যদিও সে স্বপ্ন ভাঙতে বেশি দিন লাগে নি।

পাকিস্তান আমলে ১৯৬০ সালে কাপ্তাই বাঁধের ফলে পার্বত্য চট্টগ্রামের চাকমা প্রধান অঞ্চল পানিতে ডুবে যায়। এর ফলে এক লাখ আদিবাসী নিজের ভিটা-মাটি ছেড়ে দেশান্তরিত হয়। এখানে উল্লেখ করা প্রয়োজন যে, বাঁধ দেওয়ার পূর্বে পাকিস্তান সরকার কোন প্রকার সর্তকতা বা ঘোষণা জারি করে নি। ৭০-এর নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে ত্রিদিব রায় শেখ মুজিবের সাথে দেখা করেন। শেখ মুজিব যেহেতু পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হতে যাচ্ছেন তাই তিনি পার্বত্য চট্টগ্রামকে স্পেশাল এলাকা হিসেবে ঘোষণা করার দাবী জানান। শেখ মুজিব কামাল হোসেনের সাথে এই বিষয়ে আলোচনা করার পরামর্শ দেন। পরবর্তীতে কামাল হোসেন আশ্বাস দিয়ে বলেন; শেখ মুজিব আপনার প্রস্তাব মেনে নেবেন। পরবর্তীতে ২৫শে মার্চের মধ্য দিয়ে দেশে যুদ্ধ শুরু হয়ে যায়। ফলে সব হিসাব পাল্টে যায়। দেশ স্বাধীনের পর ১৯৭২ সালে মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমা স্বায়ত্তশাসনের দাবী জানিয়ে স্মারকলিপি দেন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ মুজিবুর রহমান কাছে। তিনি স্মারকলিপি ছুড়ে ফেলে দেন এবং লারমাকে উপদেশ দিয়ে বলেন-তোমরা তোমাদের জাতিগত পরিচয় ভুলে যাও এবং বাঙালি হয়ে যাও। তিনি আরও বলেন লারমা তুমি পার্বত্য চট্টগ্রাম নিয়ে বাড়াবাড়ি করো না। প্রয়োজনে পার্বত্য চট্টগ্রামে এক..দুই…দশ লাখ বাঙালি ঢুকিয়ে দিয়ে তোমাদের জাতিগত পরিচয় মুছে দেওয়া হবে। শেখ মুজিব থেকে থেকে এমন কথা শুনে আদিবাসী নেতারা হতাশ হন। ১৯৭৩ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারি রাঙামাটির এক জনসভায় পাহাড়িদের উদ্দেশ্যে শেখ মুজিব বলেন; আমরা এখন সবাই বাঙালি। এমন বক্তব্যে পাহাড়িরা ক্ষুদ্ধ হয় এবং ১৯৭৩ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগকে ভোট না দিয়ে তার জবাব দেয়। ১৯৯১ সালের আগ পর্যন্ত পার্বত্য চট্টগ্রাম থেকে কোন আওয়ামী লীগ প্রার্থী জয় লাভ করতে পারে নি। মানুষের জাতিগত একটি পরিচয় থাকে। যেমনটি আমাদের ছিল পাকিস্তান আমলে। কিন্তু বাংলাদেশের সংবিধানের ৬নং ধারায় লেখা হয়; বাংলাদেশের নাগরিকবৃন্দ বাঙালি বলিয়া পরিচিত হইবে! সংবিধানের মাধ্যমে আদিবাসীদের উপর রাষ্ট্রকর্তৃক জোর পূর্বক বাঙালিত্ব চাপিয়ে দিয়ে তাদের পরিচয় মুছে দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে।

পাহাড়ে বাঙালিদের স্থায়ী বসতির উদ্দেশ্যে পাঠানো শুরু হয় জিয়াউর রহমানের আমল থেকে। জিয়াউর রহমান এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকের সহায়তায় ১৯৭৬ সালে পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ড গঠন করে সেখানে যোগাযোগসহ বিভিন্ন সেক্টরে বিপুল উন্নয়ন কর্মকাণ্ড- পরিচালনা করেন। এগুলো করার একটাই উদ্দেশ্য ছিল তা হল; পাহাড়ে বাঙালিদের স্থায়ী বসতি স্থাপন। জিয়াউর রহমানের আমলেই মূলত পাহাড়ে বাঙালি স্থায়ী বসতি শুরু হয়। এর মাধ্যমে শুরু হয় রাষ্ট্রীয়ভাবে ভূমি দখলের উৎসব যা এখনো সমান তালে চলছে। রাষ্ট্রীয় উন্নয়নের নামে এক দিকে পাহাড় কেড়ে নেওয়া হচ্ছে অন্য দিকে সশস্ত্র বাহিনীর সহায়তার শেল্টারদের মাধ্যমে পাহাড়িতে উচ্ছেদ করা হয়, যা এখনো চলছে। ফলে পার্বত্য চট্টগ্রামের পরিস্থিতি জটিল আকার ধারণ করে। ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় এসে শান্তি চুক্তি করে। ফলে পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক হয়। তবে এতো বছরেও সরকারের ইচ্ছার অভাবে শান্তি চুক্তির কোন কিছুই বাস্তবায়ন হয়নি বলে আদিবাসী নেতারা অভিযোগ করেন। একদিকে রাষ্ট্রীয় প্রতারণা অন্যদিকে প্রশাসনের সহায়তায় বাঙালি কর্তৃক ভূমি দখল ও আগ্রাসনে পার্বত্য চট্টগ্রামে আদিবাসীদের বসবাস কঠিন হয়ে উঠছে।

দেশের একমাত্র আদিবাসী বীরবিক্রম ইউকেচিং। তাঁর আসর নাম ইউ কে চিং মারমা। বাংলাদেশ স্বাধীন করার জন্য সমগ্র আদিবাসী সম্প্রদায় রক্ত দিয়েছেন, আদিবাসী মা-বোন পাকিস্তানীর হাতে ধর্ষিত হয়েছেন কিন্তু রাষ্ট্রীয়ভাবে তা আমরা স্মরণ ও স্বীকৃতি দিতে কৃপণতা করি। একমাত্র আদিবাসী নারী মুক্তিযোদ্ধা কাঁকন বিবি। অদ্ভুত বিষয় হচ্ছে; আদিবাসী মুক্তিযোদ্ধাদের অনেকের নাম তালিকায় আসে নি। সংখ্যাগুরু সবসময় চাপিয়ে দেওয়া পছন্দ করে। গত সপ্তাহে প্রাণ গ্রুপের মালিক আমজাদ চৌধুরী যারা যায়। তিনি অসংখ্য বাঙালি অফিসারের মতন পাকিস্তানীদের পক্ষে মুক্তিযুদ্ধের বিপক্ষে যুদ্ধ করে। আমাদের সোশ্যাল মিডিয়াগুলোতে আমজাদ চৌধুরী মারা যাওয়ার পর তিনি আহমাদিয়া, এই পরিচয়টি হাই লাইট আকারে প্রকাশ করে। এই একই বিষয়টি চাকমা রাজা ত্রিদিব রায়ের বেলায় চাকমা পরিচয়টি হাই লাইট করা হয়েছিল। অথচ আমরা কী কখনো শুনেছি; রাজাকারের শিরোমণি গোলাম আযম একজন সুন্নি রাজাকার কিংবা যুদ্ধাপরাধী সাঈদী মুসলিম রাজাকার? শুনি নি কারণ এখানে আমরা সংখ্যাগুরু তাই এমনভাবে তারা পরিচিত হয় নি। ত্রিদিব রায় যখন মারা যায় তার লাশ যেন দেশ না আসতে পারে তার জন্য অনেক প্রতিবাদ সমাবেশ হয়েছে অথচ সংখ্যাগুরুদের রাজাকারের মধ্যমণি গোলাম আজম মারা যাওয়ার পর তার জানাজা হয় জাতীয় মসজিদে! ত্রিদিব রায়ের লাশ পবিত্র মাটিতে দাফন হবে না, তার বিরুদ্ধে আমাদের প্রতিবাদ আর গোলাম আজমের জানাজায় সংখ্যাগুরুর নীরবতা! এটা কী আমাদের জাতি প্রীতি নাকি ধর্মীয় আইডেন্টিটিতে রাজাকারের হেন্ডমাস্টারকে আমারা বাংলার মাটিতে ঠাঁই দিলাম? এমন প্রশ্ন স্বাভাবিকভাবে সামনে এসে দাঁড়ায়।

সহায়ক গ্রন্থ-
মুক্তিযুদ্ধে আদিবাসী- আইযুব হোসেন ও চারু হক
The colonel who would not repent- Salil Tripathi

{পার্বত্য চট্টগ্রাম নিয়ে তানভীর মোকাম্মেলের একটি ভিডিও ডক্যুমেন্টারি রয়েছে, নাম ‘কর্ণফুলীর কান্না’। এ পোস্টের সম্পূরক তথ্য হিসেবে ডকুমেন্টারিটির লিঙ্ক এখানে শেয়ার করা হলো। ভিডিওটি- এখানে}

Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s