বর্তমান সংকট থেকে উত্তরণ সম্ভব যদি…( বিষয়-ব্লগার হত্যা)

12195762_1073041002718646_8860343177594293341_n

বাংলাদেশ একটি কঠিন সময় অতিক্রম করছে। ব্লগার ইস্যু, অধিক সংখ্যক লেখক হত্যা’র মতন ঘটনা অতীতে বাংলাদেশে ঘটে নি। লেখকদের উপর শারীরিক আঘাত শুরু হয় ১৯৯৯ সালে শামসুর রাহমান থেকে এরপর ২০০৪ সালে ২৭ ফেব্রুয়ারি চাপাতির আঘাতে গুরুতর-ভাবে আহত হোন হুমায়ুন আজাদ। ১৯৭১ সালের ১৪ই ডিসেম্বর রাজাকারদের সহায়তায় পাকিস্তান সেনা বাহিনী কর্তৃক বুদ্ধিজীবী হত্যার পর স্বাধীন বাংলাদেশে মাটি হুমায়ুন আজাদের রক্তে প্রথম রঞ্জিত হয়!

কাদের মোল্লা’র ফাঁসির দাবীতে শাহবাগ সৃষ্টির পর বিএনপি-জামাত কর্তৃক শাহবাগের সবাইকে ব্লগার ও একই সাথে নাস্তিক ট্যাগ, বিএনপির মুখপত্র ‘আমাদের দেশ’ কর্তৃক সমাজে ব্লগারদের নেগেটিভ-ভাবে উপস্থাপন শুরু হয়। রাজিব হায়দার বাংলা ব্লগের প্রথম ব্লগার যিনি ১৫ ফেব্রুয়ারি ২০১৩’তে জঙ্গিদের হামলায় প্রাণ হারান। সারা বাংলাদেশে ব্লগারদের বিপরীতে একটি ঘৃণা’র দৃষ্টিভঙ্গি বিএনপি-জামাত তৈরি করার মধ্য দিয়ে ব্লগার হত্যা পথ মসৃণ হয়। শাহবাগের ব্যর্থতা শুরু সেখান থেকে। মানুষের কাছে বিএনপি-জামাতের দৃষ্টিভঙ্গি তারা পরিবর্তন করতে সক্ষম হয় নি।

২০১৫ সালের বছর জুড়ে বাংলাদেশে ব্লগার ও লেখক হত্যার উৎসব চলে। নর্থ-সাউথের মতন ধনী বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র থেকে মাদ্রাসার ছাত্রটিও অনুভূতি হেফাজতের জন্য বেডরুম থেকে চাপাতি হাতে বেরিয়ে পড়ছে। দুঃখজনক হলেও বাস্তবতা হল, আমরা সবাই প্রতিটি ঘটনার পর হত্যার বর্ণনা কিংবা খুনিদের গালমন্দ করতে করতে ক্লান্ত হয়ে বিষয়টি ওখানেই ক্ষেমা দিয়ে দিই। প্রতিটি হত্যার পর এক পক্ষ বলতে শুরু করেন এর সাথে ধর্মের কোন যোগসূত্র নেই, অন্যদিকে ব্লগারদের আরেকটি ছোট অংশ ধর্ম ও ধর্ম পুরুত ঠাকুরদের গুষ্ঠি উদ্ধার করে কয়েকদিন ফেসবুকে লেখা-লেখি করে। এই দুপক্ষের কেউ-ই সমস্যার সমাধান কিংবা সমস্যা চিহ্নিত করার প্রতি আগ্রহী এমনটি মনে হয় না।

হিটলারের আত্মহত্যার সাথে সাথে নাৎসিবাদও আত্মহত্যা করেছে এমনটি আশা করা বোকামি। মতবাদের কখনো মৃত্যু হয় না। জার্মানি’তে নাৎসি বাহিনী নিষিদ্ধ হলেও সমাজের ভেতরে এখন নাৎসিবাদের অস্তিত্ব বিদ্যমান। হয়তো শক্তিশালী নয় কিন্তু এর মানে এই নয় তা বিলীন হয়ে গেছে। জঙ্গি-মতবাদও একটি আদর্শের নাম, একটি মতবাদের নাম। যেমনটি হিন্দুত্ব। ‘হিন্দুত্ব’ শব্দটির স্রষ্টা বিনায়ক দামোদর সাভারকার। ১৯২৩ সালে তিনিই প্রথম ‘হিন্দুত্ব’ প্রবন্ধের ভাব-বস্তু হিসেবে এই শব্দটি উদ্ভাবন করেন। অনেকে এখনও এটিকে হিন্দুধর্মের সঙ্গে একাসনে বসালেও, স্বামী বিবেকানন্দ, স্বামী রামতীর্থরা কিন্তু কোনও দিন হিন্দুত্ব শব্দটি ব্যবহার করেন নি। হিন্দুত্ব প্রকৃতপক্ষেই একটি রাজনৈতিক দর্শন যেমন আমাদের উপমহাদেশে আছে- মুসলমানিত্ব।

ইসলাম হল একটি ধর্ম যা সাধারণ মানুষ দৈনন্দিন জীবনের সাথে একটি বিশ্বাস মেনে আচার হিসেবে পালন করে। জঙ্গি-মতবাদ হল ইসলামের রাজনৈতিক রূপ! যেখানে কিছু ইসলাম ধর্ম পালনকারী তাদের মত অনুসারে একটি ইসলামিক রাষ্ট্র কায়েমক করতে চায়। এখানে খেয়াল রাখা উচিত; সব মৌলবাদী লাখ ফেলে দেওয়ার পক্ষে হলেও রাষ্ট্র পরিচালনা কিংবা ধর্মীয়গতভাবে তাদের দৃষ্টিভঙ্গিতেও পার্থক্য বিদ্যমান। যেমন-বর্তমান মৌলবাদে আতুর ঘর হল মধ্যপ্রাচ্যের ওহাবিইজম।

জনগণের মধ্যে বিভাজন শুরু হয় সালাফি মতবাদের প্রবক্তা ইবনে তাইমিয়া’র মধ্য দিয়ে। ইবনে তাইমিয়া’র অনুসারীরা সালাফি নামে পরিচিত। ইবনে তাইমিয়া শুধু তার নিজ অনুসারীদেরকেই মুসলমান মনে করতেন ও ইসলামের অন্যান্য মতের অনুসারীদের কাফের/মুশরিক ফতোয়া দেন। তবে ইবনে তাইয়েমা জীবদ্দশায় তার মতবাদ তেমন প্রচার করতে পারেন নি। তৎকালীন আলেম ওলামাগণ তাকে পথভ্রষ্ট আখ্যা দেন। তার মৃত্যুর পর তার মতবাদ পুনর্জীবিত করেন নজদের মোহাম্মদ ইবনে আব্দুল ওহাব। ওহাবের মতাদর্শকেই বর্তমান পৃথিবী ওহাবী মতবাদ হিসেবে জানে। এই আব্দুল ওহাব ইবনে সৌদের সাথে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক স্থাপন করেন ও তারা পরস্পর পুত্র-কন্যাকে বিয়ে দেন। বর্তমান অ-সহিষ্ণু মতবাদের আরেক স্রস্টা এই ওহাব। যে মতবাদ সৌদি আরব রাষ্ট্রীয়ভাবে পৃষ্ঠপোষকতা করে আসছে। বর্তমান বিশ্বের বেশির ভাগ জঙ্গি-সংগঠন ওহাবী ও সালাফি মতবাদে বিশ্বাসী। বর্তমান বিশ্বের সবচেয়ে আলোচিত জঙ্গি সংগঠন ISIL কিন্তু সালাফি সুন্নি সংগঠন। যেমন সৌদি’তে ওহাবীরা শক্তিশালী, মিশরে সালাফিরা ভারতীয় উপমহাদেশে মওদুদী-বাদীরা। এই তিন মতবাদ মানুষকে অ-সহিষ্ণুতা এবং অন্যকে অস্বীকার করা ছাড়া কিছুই শেখায় না। পত্রিকায় ইতোমধ্যে আমরা দেখেছি সিরিয়ার ইসলামিক সন্ত্রাসবাদী সংগঠন আইএস আফগানিস্তানের সন্ত্রাসবাদী সংগঠন আল-কায়দা’র বিরুদ্ধে জিহাদ ঘোষণা করেছে। লক্ষণীয় বিষয় হল; দু’টি সংগঠনই সন্ত্রাসবাদের চর্চা করলেও তাদের মধ্যে রাজনৈতিক দর্শনের মতবিরোধ হয়েছে। এতক্ষণ তো সমস্যা, সমস্যা কোথা থেকে উৎপত্তি হচ্ছে এগুলো নিয়ে কথা বললাম। তাহলে এখন প্রশ্ন আসে এর সমাধান কোথায়?

10996092_1072967342726012_9004793902338118794_n

কীভাবে সংকট থেকে উত্তরণ সম্ভব?

টেলিভিশন:

পত্রিকার নিচে সাধারণ মানুষের বিভিন্ন কমেন্ট দেখা যায়। সেখানে লক্ষণীয় বিষয় হল এমন সব কমেন্টের মুখোমুখি আমরা হচ্ছি যেসব নিয়ে অতীতে আমাদের ভাবতে হয় নি। যেমন-অন্য ধর্মের ধর্মীয় উৎসবে শুভেচ্ছা জানান হারাম কিনা তা এই বঙ্গের বাঙালি মুসলমান কখনো ভাবে নি। এমন প্রশ্নও তেমনিভাবে কেউ তোলে নি। কিন্তু জাকির নায়েকের হাত ধরে ধর্মীয় চ্যানেল হিসেবে পিস টিভি আজ মানুষের ঘরে। সেই টিভি থেকেই মানুষ এসব উগ্র, অসহনশীল, অমানবিক প্রশ্ন আজকে তুলছে। এখানে আমি মানুষ থেকে বরং রাষ্ট্র-যন্ত্র’কে দোষারোপ করব এই কারণে যে রাষ্ট্র ওহাবীমতবাদের টেলিভিশন মানুষের বেডরুমে পৌঁছে দিয়েছে। ঐ টিভি দেখে কোন বাচ্চা যদি এগুলো শেখে তাহলে সেটা কী বাচ্চার দোষ হবে? তাহলে আমরা কী দেখছি, কী দেখাচ্ছি সেটার দিকেও খেয়াল রাখা জরুরী।

মসজিদ:

বর্তমানে জঙ্গিদের আশ্রয়স্থল হিসেবে মসজিদগুলো ব্যবহৃত হচ্ছে। যে কোন অপরাধ করে সহজেই মসজিদে ঢুকে অন্যদের সাথে মিশে যাওয়া সম্ভব। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পাশে কাঁটাবন জামে মসজিদ জঙ্গিদের নিরাপদ আশ্রয়স্থল। এমন হাজারো মসজিদে তারা আস্তানা গেড়েছে। বাংলাদেশে কয়েক লক্ষ মসজিদ আছে। কিন্তু ‘ইসলামিক ফাউন্ডেশন’ কী সেই মসজিদগুলো’তে কী হচ্ছে তার তদারকি করে? মসজিদ হওয়ার আগে জেলা প্রকাশক থেকে অনুমতি, মসজিদ কমিটিতে সরকারী একজন চাকুরীজীবী’কে বাধ্যতামূলকভাবে যুক্ত করা, মসজিদের খুৎবায় কী বলা যাবে কিংবা কী বলছে এই বিষয়ে নজর রাখার মধ্য দিয়ে সারা বাংলাদেশের মসজিদগুলো’তে জঙ্গিদের আস্তানা ভেঙে দেওয়া সম্ভব। বিশ্ববিদ্যালয়ের মসজিদেও কোন জঙ্গিমতবাদ প্রচার হচ্ছে কিনা সে দিকেও নজর রাখতে হবে। ইতোমধ্যে আমরা জেনেছি রাজিব হায়দার হত্যারকারী’র সবাই নর্থ-সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের মসজিদেই একের সাথে অন্যের পরিচয় হয়। এছাড়া কিছু আলেম যদি নামাজের খুৎবার সময় উস্কানিমূলক বক্তব্য দিচ্ছে কিনা, জঙ্গিবাদ ছড়াচ্ছে কিনা তা নজরদারী’র মাধ্যমেই নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। এবং এর পাশাপাশি জঙ্গিবাদ বিরোধী সহনশীলতা’র মতবাদ প্রচার করতে হবে। ভাই গিরিশ চন্দ্র যখন কোরান বাংলাতে অনুবাদ করেন তখন ওনার বাসায় মৃত্যুর হুমকি দিয়ে চিঠি পাঠায় উগ্রবাদীরা। আবার মুসলিম সম্প্রদায় থেকে উনি ভাই খেতাব অর্জন করেন। সুতরাং মানুষকে এই দানব হওয়াকে রহিত করা সম্ভব।

মাদ্রাসা:

স্বাধীনতার পর সরকারী স্কুল বেড়েছে কয়েক গুণ কিন্তু মাদ্রাসা’র সংখ্যার বেড়েছি কয়েক হাজার গুণ। এই মাদ্রাসা আবার বিভিন্ন ভাগে বিভিন্ন  মতাদর্শে পরিচালিত হয়। অদ্ভুত শোনা গেলেও সত্য হল, সরকারের এই বিষয়ে কোন নিয়ন্ত্রণ ও মাথা ব্যথা নেই। ধর্মের নামে সরকারী স্কুল কলেজেও সাম্প্রদায়িকতার চর্চা করা হয়। অন্যদিকে মাদ্রাসায় ধর্ম শিক্ষার নামে এক প্রকাশ নাৎসি মতবাদই শিক্ষার্থীদের শেখানো হচ্ছে। আদিল মাহমুদ “ধর্মশিক্ষার মাধ্যমে সাম্প্রদায়িকতার সরল পাঠ” নামে তিন পর্বের একটি বিশ্লেষণমূলক ব্লগ লিখেছেন আগ্রহীরা দেখতে পারেন। মাদ্রাসার উপর সরকারের নিয়ন্ত্রণ নেই বিধায় মাদ্রাসার শিশুরা ধর্মীয় শিক্ষার নামে মূলত বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের মতবাদ শিক্ষা হিসেবে গ্রহণ করছে। বাংলাদেশে আনাচে-কানাচে মাদ্রাসা তৈরি হচ্ছে। অথচ মাদ্রাসা তৈরিতে ও তাদের পাঠ্যপুস্তকে সরকারের কোন নিয়ন্ত্রণ নেই। সরকারের আপোষকামীতায় বর্তমানে মাদ্রাসাগুলো জঙ্গি-মতবাদে বিলীন হচ্ছে।

ওয়াজের নামে নাৎসিবাদ:

বাংলাদেশে শীতকালে গ্রামে-গঞ্জে ধর্মীয় ওয়াজের নামে বিভিন্ন উগ্র মতবাদ ছড়িয়ে পড়ছে। ওয়াজগুলো বেশির ভাগই রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে করা হয়। যেমন-যুদ্ধাপরাধ বিচারে সাজাপ্রাপ্ত আসামী রাজাকার সাঈদী ওয়াজে বলত যে, জামাতকে ভোট দিলে বেহেস্ত নিশ্চিত কিংবা জামাত হল একমাত্র ইসলামিক দল। এরূপ অন্যরাও একই কথা বলে। তাদের মধ্যে কেউবা ওহাবী কেউবা সালাফি কেউবা মৌদুদী মতবাদ ধর্মের নামে ছড়িয়ে দিচ্ছে। ইসলামিক ফাউন্ডেশনের এক মাওলানা বলছেন, ওনারা ওয়াজের উপর নজরদারী শুরু করেছেন। ওনার কথায় স্পষ্ট যে স্বাধীন বাংলাদেশে এতো বছর ধরে নিয়ন্ত্রণ তো পরের বিষয় কোন নজরদারীও কেউ করে নি। এখন অনেকেই বলবেন নিয়ন্ত্রণ করলে তাহলে স্বাধীনতাটা থাকল কোই। তাদের উদ্দেশ্যে, স্বাধীনতা শব্দটার সাথে দায়িত্বও যুক্ত থাকে। কাউকে হুমকি ধমকি কিংবা হত্যা করার জন্য উস্কানি তো আর স্বাধীনতা হতে পারে না।

ব্লগার, লেখকদের সাথে মাওলানাদের মত বিনিময় সভা:

বর্তমান সময়ের প্রেক্ষাপটে বিষয়টি কিছুটা কঠিন এই কারণে যে কেউ নিরাপত্তার অভাবে মতবিনিময় করতে যাবে না। কিংবা গেলেও নিজের চিন্তাধারা প্রকাশের কোন সাহস পাবে না। হয়তো অনেক দেরি হয়ে গেছে তবে ভবিষ্যতে এই কাজটি করা যেতে পারে। বাংলাদেশের মানুষ গুজবেই আস্তা রাখে ফলে মত-বিনিময়ের কারণে নিজেদের মধ্যে অনেক ভুল-বোঝাবুঝির সমাপ্তি হওয়া সম্ভব।

কেন্দ্রীয় কারাগার

বর্তমানে জেল খানা হল জঙ্গি নেটওয়ার্ক তৈরি করার উত্তম স্থান। অভিজিৎ রায়ের হত্যার পরিকল্পনাও জেল থেকেই হয়েছে বলে পুলিশ দাবী করেছে। এছাড়াও আমরা পত্রিকার মাধ্যমে দেখেছি কীভাবে একজন সাধারণ জঙ্গি জেলখানায় গিয়ে ভয়ংকর জঙ্গিতে রূপান্তরিত হচ্ছে। সিরিয়ার আইএসআইএল এর প্রধান বাগদাদীও জেল খেনাতেই প্রথম শক্তিশালী জঙ্গি নেটওয়ার্ক গড়ে তোলে। তাই জেল খানায় যাতে জঙ্গিরা নেটওয়ার্ক তৈরি করতে না পারে তার জন্য বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে।

সরকারের দায়িত্ব:

সুশাসন প্রতিষ্ঠা, বিচার-হীনতার সংস্কৃতি দূর করতে হবে এগুলো আমরা সবাই জানি। জনগণের মাঝে যেহেতু ব্লগার কিংবা ব্লগ হিসেবে একটা নেতিবাচক ধারণা সৃষ্টি হয়েছে সেজন্য সরকারের উচিত হবে ব্লগ কী, ব্লগার কী তা নিয়ে টিভি’তে কোন সচেতনমূলক অনুষ্ঠান আয়োজন করা। ফলে অনেকের মাঝে ভুলটা ভাঙবে। বর্তমান পরিস্থিতিতে কোন ইসলামিক ব্লগার’কে যদি ব্লগার বলে গ্রামে ছেড়ে দেওয়া হয় তাহলেও তার মৃত্যু ঝুঁকি সৃষ্টি হবে। মনে রাখতে হবে ইন্টারনেট একসময় বাংলাদেশের মানুষ পর্ণ দেখার একমাত্র মাধ্যম হিসেবে বিবেচনা করত। কিন্তু এখানে এসে যে হাজার হাজার বই পড়ার সুযোগ আছে তা এখন আমরা জানি।

ব্লগারদের উদ্দেশ্যে কিছু কথা কিছু প্রশ্ন:

প্রথম আলো’র সাক্ষাৎকারে শুদ্ধস্বরের প্রকাশক আহমেদুর রশীদ চৌধুরী চমৎকার কথা বলেছেন এবং একটি প্রশ্ন তুলেছেন।

“ আমার অফিসে এসে যখন কুড়ি-পঁচিশ বছর বয়সী যুবক মাথায় চাপাতির কোপ দেয়, তখন সে একটা বিশ্বাস নিয়ে কাজটা করেছে। আমরা কি তৃণমূলে মুক্তমতের ধারণা পৌঁছাতে পেরেছি? ওরা কিন্তু ঠিকই ওর বিশ্বাসের জায়গাটা গড়ে দিয়েছে, যেটা আমরা পারি নি। এভাবে শুধু পুলিশ দিয়ে কি জঙ্গিবাদ দমন করা যাবে? এটা আমাদের সবার ব্যর্থতা। আমরা সবাই ব্যর্থ হয়েছি।”

২৬শে ফেব্রুয়ারি অভিজিৎ রায়ের মৃত্যু দিবসে প্রশ্নটি সবার কাছে রাখব ভেবেছিলাম। আমরাও একই প্রশ্ন সেসব ব্লগারদের প্রতি, যারা বাংলাদেশে মুক্তচিন্তার আন্দোলন করছেন বলে দাবী করেন তাদের প্রতি-এতোগুলো প্রাণ যাবার বিনিময়ে ব্লগারদের অর্জন কতোটুকু? আমরা কী জনসাধারণকে বিশেষ করে মধ্যবিত্ত শিক্ষিত সমাজকে কতোটুকু নিজেদের পক্ষে আনতে পেরেছি? যদি না পেরে থাকি তাহলে সমস্যাটা কোথায়?

যারা ভাবেন মানুষ ধর্মান্ধ, সরকার ব্লগারদের বিপক্ষে, জঙ্গিদের পরোক্ষভাবে মানুষ সাপোর্ট দিচ্ছে  সুতরাং এই দেশে পরিবর্তন সম্ভব নয়। তাদের উদ্দেশ্যে একটিই উক্তি করা যায় তাহলো, যারা এমনটি ভাবছেন তারা আসলে স্রোতে গা ভাসিয়ে ছিলেন। সমাজ পরিবর্তন, ধর্মান্ধ-মুক্ত সমাজ সৃষ্টির প্রয়াস কখনো আপনাদের ছিল না। যদি থাকত তাহলে প্রতিটি হত্যার পর অনেক বেশি দায়িত্বশীল আচরণ দেখা যেত। হ্যাঁ, চালের বস্তায় কাঁকড় থাকবেই। কিন্তু চাল থেকে যদি কাঁকড়ের ওজন বেশি হয় তাহলে  মানুষ বস্তাটাকেই মানুষ ফেলে দেয়। বাংলাদেশের সমাজ ইউরোপের মতন নয় তা যেমন সত্য তেমনি ইউরোপ জন্ম থেকেই বাক-স্বাধীনতার দেশ ছিল না সেটিও সত্য। এই জায়গার আসতে তাদের অনেক রক্ত, শ্রম দিতে হয়েছে।  ২০১৫ সালে এখন পর্যন্ত চারজন ব্লগাং ও ফেসবুকার, ১ জন প্রকাশক নিহত হয়েছে। এছাড়া লেখক প্রকাশকসহ আহত হয়েছে ৪ জন। এতোগুলো প্রাণের বিনিময়ে  আমাদের সংগ্রাম তাহলে কতদূর অগ্রসর হল? ধর্মান্ধরা যেমন আয়নার সামনে না দাঁড়িয়ে অন্যদের উপর দোষ চাপায়। আমরাও আয়নার সামনে দাঁড়াতে সাহস পাই না। নিজেদের এখনো প্রশ্ন করতে শিখি নি। এছাড়া সম্প্রদায় প্রীতি ও ভুল পদক্ষেপের কারণে নিজেদের আন্দোলনের পথ দিন দিন যে আরও সংকীর্ণ হয়ে উঠছে তা নিয়ে প্রশ্ন তুলছি না। আমার এই লেখটি তাদের প্রতি যারা পরিবর্তন চান, যারা সমাজে আস্তিক-নাস্তিককের সহবস্থানে বিশ্বাসী। আর যারা ব্যক্তিগত ক্ষোভ, ঘৃণার চর্চা, নিজেদের আমিত্বের প্রচারে ব্যস্ত তাদের উদ্দেশ্যে আমার এই লেখা নয়। সমাজ পরিবর্তনের জন্য হয়তো আপনার পথ ভিন্ন কিন্তু সেই পথের পথিক আমি নই। ধন্যবাদ।

12208863_1073564905999589_7183031338283175676_n

Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s