বাবরি মসজিদ ঘটনার পূর্বে ও পরে অগ্নিদগ্ধ বাংলাদেশ

অদ্ভুত আঁধার এক এসেছে এ-পৃথিবীতে আজ,
যারা অন্ধ সবচেয়ে বেশি আজ চোখে দ্যাখে তারা;
যাদের হৃদয়ে কোনো প্রেম নেই – প্রীতি নেই – করুণার আলোড়ন নেই
পৃথিবী অচল আজ তাদের সুপরামর্শ ছাড়া।
যাদের গভীর আস্থা আছে আজো মানুষের প্রতি
এখনো যাদের কাছে স্বাভাবিক ব’লে মনে হয়
মহত্‍‌ সত্য বা রীতি, কিংবা শিল্প অথবা সাধনা
শকুন ও শেয়ালের খাদ্য আজ তাদের হৃদয়।

-জীবনানন্দ

৯০ সালের আগে ও নব্বই দশকে ভারতের বাবরি মসজিদের ইস্যুকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশের অমুসলিমদের উপর বয়ে যায় সাম্প্রদায়িক ঝড়। সেই ঝড়ে কয়েক লক্ষ মানুষ রাতের আঁধারে বাড়ি ছেড়ে বেরিয়ে যায়, কেউবা রাতের আধারে সাম্প্রদায়িক আমলার শিকার হোন,কেউবা হোন-পুলিশের উপস্থিতিতে নির্যাতিত। মিডিয়ার কল্যাণে এতো বছর পরও বাবরি মসজিদের ঘটনা এই অঞ্চলের মানুষের মন থেকে বিস্মৃতি হয় নি। কিন্তু মুছে গেছে বাবরি মসজিদ ভাঙার সাথে বাংলাদেশের সেই সব মানুষগুলোর কথা,যারা কোনভাবে এই ভাঙার সাথে যুক্ত না হয়েও বাবরি মসজিদ ভাঙার খেসারত দিতে হয়েছিল। বাংলাদেশ রাষ্ট্র ও মিডিয়া বিষয়টি পুরোপুরি চেপে যায়। এই ইন্টারনেটের যুগেও আপনি গুগল করে দেখলে আশ্চর্য হবেন যে,বাবরি মসজিদ ঘটনায় বাংলাদেশে কী হয়েছিল তার কোন বিশদ উল্লেখ নেই। যদি উল্লেখ থাকেও তাও এক দুই লাইনের মধ্যে সীমাবদ্ধ। বলা যায়, এই বিষয়ে লেখা-লেখি কিংবা জানতে চাওয়াও বাংলাদেশ রাষ্ট্রে এক ধরণের অপরাধের পর্যায়ে পড়ে। বাংলাদেশে তিনটি সম্প্রদায়ের উপর নিয়মিত নির্যাতন চলে আসছে।–হিন্দু সম্প্রদায়, আদিবাসী সম্প্রদায় (যারা নিজ ভূমিতে সংখ্যালঘুতে পরিণত হয়েছে, নিজ ভূমি থেকে উচ্ছেদ হয়েছে, আহমদিয়া সম্প্রদায় (যারা কয়েক লাখ থেকে কয়েক হাজারে নেমে এসেছে, ধর্ম পালন করতে হয় গোপনে)।

ধর্মীয় জাতীয়তাবাদের কোন সীমারেখা নেই। বিজ্ঞানের অগ্রযাত্রায় মানুষ মঙ্গল গ্রহে বসবাস করার সাহস দেখাচ্ছে। হয়তো একদিন মানুষ সেখানে মানব বসতিও গড়বে। ধারণা করি, সেখানে কোন সাম্প্রদায়িক ঘটনা হলে তার প্রতিক্রিয়া হবে ভবিষ্যৎ পৃথিবীতে! ভারতে কংগ্রেসের ব্যর্থতায় বিজেপি ক্ষমতায় আসার পর ধর্মীয় ফ্যাসিজম বৃদ্ধি পেয়েছে। সেখানকার অনেক মানুষ এর প্রতিবাদ করছে। যেমন-লেখকরা জাতীয় পুরষ্কার বর্জন করছেন, পরিচালকরা পুরষ্কার ফিরিয়ে দিচ্ছেন। এর মাধ্যমে আমরা কিছুটা হলেও রাষ্ট্রের উপর সাধারণ মানুষের চাপ প্রয়োগ তা দেখতে পাই। অথচ একই বিষয় বাংলাদেশে হলেও এখানে রাষ্ট্রে ভিন্ন-সম্প্রদায়ের উপর হামলার কথা স্বীকার করছে না, সংসদে এই নিয়ে কোন আলোচনাও করছে না, লেখক-বুদ্ধিজীবী সবাই বালুতে মাখা গুজে বসে আছেন। কবির ভাষার বলতে হয়-

“আজ ধর্ষণের দিন, কৃষ্ণ গেছে দূর পরবাসে।
ইতিহাস মাথা গোঁজে মৌলবাদী শিশ্নসমাবেশে।”

বাংলাদেশে ভিন্ন সম্প্রদায়ের উপর হামলার শুরু বাবরি মসজিদ থেকে নয় বরং স্বাধীনতার পরপর থেকেই ধারাবাহিকভাবে হামলা হয়ে আসছে। স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় অনেক মানুষ ভারতে আশ্রয় নিয়ে বাংলাদেশে এসে দেখল তাদের বাড়ি দখল করে পেরেছে স্থানীয় প্রভাবশালী নেতারা। এছাড়াও পাকিস্তান আমল থেকে শত্রুর সম্পত্তি নামক একটি কালো আইন বাংলাদেশে ভিন্ন সম্প্রদায়ের জমি দখলে সহায়তা করছে। বাংলাদেশের ভিন্ন সম্প্রদায়ের মানুষ নিজেদের সম্পত্তি কতোটুকু নিরাপদে রাখতে পারছে তার সবচেয়ে বড় প্রমাণ ঢাকার জাতীয় মন্দির ঢাকেশ্বরী। ঢাকেশ্বরী মন্দিরের কিছু জমি এখনও দখল হয়ে আছে। ঢাকার প্রাণকেন্দ্রে যেখানে জাতীয় মন্দিরের জমি দখল হয়ে যায় সেখানে সামগ্রিক পরিস্থিতি কতোটা নাজুক তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। (নিউজ লিংক-এখানে)

১৯৭৩ সালে সাভারে এক হিন্দু সম্প্রদায়ের দোকানদার কাগজ দিয়ে বিড়ি বানাচ্ছিলেন। সেই কাগজের ভিড়ে আরবি লেখা কাগজও ছিল। কে বা করা এলাকায় রটিয়ে দিলে যে, এই দোকানে কোরানের পাতা ছিঁড়ে বিড়ি বানানো হচ্ছে। মুহূর্তে শতশত লোক ঐ দোকানে হামলা করে দোকানটিতে আগুন ধরিয়ে দেয়। তবে দোকানদার আগেই পালিয়ে প্রাণ বাঁচান। ভিন্ন সম্প্রদায়ের উপর বড় হামলা শুরু হয় ৯০ দশক থেকে। বাবরি মসজিদ ঘটনায় বাংলাদেশ থেকে কয়েক লক্ষ মানুষকে দেশ থেকে উচ্ছেদ হয়। এর পর বড় হামলা আসে ২০০১ সালে বিএনপি-জামাত ক্ষমতা আসার পর। সেই সময় পূর্ণিমা নামের একটি বাচ্চা মেয়েকে কয়েকজন মিলে ধর্ষণ করে। মেয়ের জীবন বাঁচাতে অসহায় মা ধর্ষকদের পা’চেয়ে ধরে বলেছিল; আমার মেয়েটা ছোট তোমরা একজন একজন করে যাও! ২০০১-এর পর ভিন্ন সম্প্রদায়ের উপর হামলার বিচার একমাত্র পূর্ণিমা পেয়েছে তাও ১০ বছর পর ৪ মে ২০১১ তে! এরকম হাজারো পূর্ণিমা নির্যাতিত হয়েছেন, নীরবে দেশ ত্যাগ করেছেন। বাবরি মসজিদের সময় বাংলাদেশের পত্রিকা ও সরকার যেহেতু ধামা-চাপা দিয়ে দিয়েছে সেহেতু সেই সময়টা বুঝতে আমাদের সহায়তা করবে ২০০১ সালের ঘটনাগুলি। ২০০১ সালের পর কী হয়েছিল নিম্মে ছবির মাধ্যমে তার ক্ষুদ্র একটি অংশ তুলে ধরা হলা।

এরপর বাংলাদেশে বড় হামলা হয় কক্সবাজার জেলার রামুতে ২০১২ সালের ১ অক্টোবর। ফেসবুকের কথিত একটি ছবিকে কেন্দ্র করে ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাতের অভিযোগে শত বছরের পুরাতন রামুর বৌদ্ধ মন্দির ও বৌদ্ধ ধর্মের মানুষগুলোর উপর হামলা চালানো হয়। সেই হামলায় অংশ নেয়-মায়ানমার থেকে আগত রোহিঙ্গা থেকে শুরু করে স্থানীয় মুসলমানরা। যারা সবাই ছিল আওয়ামী,বিএনপি,জামাত থেকে শুরু করে সকল দলের নেতাকর্মী! তৎকালীন রামু থানার ওসি বলে-পুলিশের পোশাক পরা না থাকলে আমি নিজেও হামলায় অংশ নিতাম। এই ঘটনায় যারা গ্রেফতার হয়েছিল তারা পরবর্তীতে ছাড়া পেয়ে যায়। এবং সেই জামিনের ব্যবস্থা করে দেয় স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতারা। বাবরি মসজিদে হামলার ২০ বছর ২৫ বছর স্মরণে বাংলাদেশের পেপার পত্রিকায় বিভিন্ন সম্পাদকীয় লেখা হলেও বাবরি মসজিদের কারণে বাংলাদেশের সংখ্যালঘুর উপর কী দিয়ে বয়ে গেছে তা উল্লেখ করার প্রয়োজন বোধ তারা করে না। ফলে বাবরি মসজিদের ঘটনার পর বাংলাদেশে যে নির্যাতন হয়েছে তা আমাদের মিডিয়া ও সরকার সফল ভাবে চেপে যেতে সক্ষম হয়েছে।

কক্সবাজারের রামু

জিয়াউর রহমানের হাত ধরে সংবিধানে বিসমিল্লাহ ও এরশাদের হাতে বাংলাদেশ রাষ্ট্রের খৎনা হয়ে রাষ্ট্র ধর্ম ইসলাম সংবিধানে যুক্ত করে অঘোষিতভাবে অমুসলিমদের দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিক বানিয়ে দেওয়া হয়েছে। এরশাদ সংবিধানের সংশোধনী করে ১৯৭২ সালের সংবিধানে ধর্মনিরপেক্ষতা বাতিল করে ইসলামকে বাংলাদেশের রাষ্ট্রধর্ম করা সত্ত্বেও পরবর্তীকালে আওয়ামী লীগ তাদের ১৯৯৬ এবং ২০০৯ সালের সরকার আমলে তা বাতিল না করে আজ পর্যন্ত বহাল রেখেছে! এছাড়া ১৯৭১ সালের পর পাকিস্তানি আমলের ‘শত্রু সম্পত্তি আইন’ বাতিল না করে তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার তার নাম রেখেছিল ‘অর্পিত সম্পত্তি আইন’। এসবই হচ্ছে নির্বাচনী মাঠে আওয়ামী লীগের সাম্প্রদায়িক রাজনীতি। বর্তমান সরকার যেহেতু মদিনা সনদে দেশ চালাচ্ছে সেহেতু এটি স্পষ্টত যে ১৯৭২ এর সংবিধানে আওয়ামীলীগ নিজেও ফিরে যেতে ইচ্ছুক নয়।

স্বাধীন বাংলাদেশে প্রথম সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর বড় ধরনের হামলা হয় ৯০ সালে,এরশাদের উস্কানিতে। এরপর খালেদা জিয়ার আমলে ১৯৯২ সালে ভারতে বাবরি মসজিদ ভাঙার পর। এছাড়াও পাহাড়ের আদিবাসীদের উপর অত্যাচার, রাষ্ট্রীয় বল প্রয়োগ বাংলাদেশ রাষ্ট্র সৃষ্টি হওয়ার পর থেকে ধারাবাহিকভাবে চলে আসছে। ১৯৭১ সালে মোট জনসংখ্যার ১৮ দশমিক ৪ শতাংশ ছিল হিন্দু, ১৯৮১ সালে তা এসে দাঁড়ায় ১২.১ শতাংশে,১৯৯১ সালে ১১ ও ২০০১ সালে ৯ শতাংশ। বর্তমানে ৮ শতাংশে এসে ঠেকেছে। তারপরও রাষ্ট্র বিবৃতি দিচ্ছে দেশে অমুসলিমরা নিরাপদে আছে!

দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে ‘গণ-তদন্ত কমিশন’ ধর্মীয় ও নৃতাত্ত্বিক সম্প্রদায়ের অধিকার রক্ষায় সাত দফা সুপারিশ পেশ করেছে।

দফাগুলো হচ্ছে :

১. বাংলাদেশ একটি বহু-ধর্মীয় ও একাধিক জাতিসত্তা-ভিত্তিক রাষ্ট্র এবং সে কারণেই ধর্মনিরপেক্ষতা হলো জনসাধারণের সুখ-সমৃদ্ধি ও উন্নতির পূর্বশর্ত_এ বিশ্বাসে সরকারকে অঙ্গীকারবদ্ধ হতে হবে এবং জনগণের মধ্যে তার এই নৈতিক অবস্থান ও তার কার্যকারণ স্পষ্টাকারে তুলে ধরতে ও কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে। সংবিধানের রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতিতে প্রশাসনিক, নিরাপত্তা, শিক্ষাব্যবস্থাসহ সব রাষ্ট্র পরিচালন ব্যবস্থায় ধর্মনিরপেক্ষতা ও সমঅধিকার-নীতির প্রতিফলন ও বাস্তবায়ন ঘটাতে হবে। সরকারি-বেসরকারি চাকরিতে সংখ্যালঘু নিয়োগের ক্ষেত্রে যে বৈষম্য রয়েছে, তা নিরোধকল্পে সব ধরনের প্রতিষ্ঠানে, বিশেষ করে জনপ্রশাসনে, শান্তি-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী সব বাহিনীতে পুলিশ, বিডিআর, আনসার, সেনাবাহিনী ইত্যাদিতে ক্রমবর্ধমান হারে নিয়োগ করে এ উদ্দেশ্য স্পষ্ট করতে হবে।

২. সংবিধানে পরবর্তীকালে সাম্প্রদায়িক দৃষ্টি-কোন থেকে যেসব সংশোধনী আনা হয়েছিল, যা মৌলিক অধিকারের পরিপন্থী যেসব বাতিল করে সংবিধানকে ১৯৭২ সালের আদিরূপে প্রতিষ্ঠিত করতে হবে সরকারকে।

৩. রাষ্ট্র-দর্শনে ধর্ম সম্পর্কে কোন একদেশদর্শী দৃষ্টিভঙ্গির প্রকাশ ঘটানো ও তদনুযায়ী প্রশাসনিক কাজকর্ম পরিচালনা করা যাবে না। কারণ, রাষ্ট্র ও সরকারের দৃষ্টিতে সব ধর্ম সমান।

৪. (ক) সংখ্যালঘু, আদিবাসী ও উপজাতিসহ সব ধর্মীয়, ভিন্ন ভাষাভাষী, বিভিন্ন নৃ-গোষ্ঠীর মানুষকে জাতির মূলস্রোত থেকে বিচ্ছিন্ন-কারী ও বৈষম্যমূলক যেসব আইন বা সরকারি বিধিনিষেধ প্রণীত হয়েছে, যা তাদের সাংবিধানিক অধিকারকে সংকুচিত করেছে (যেমন অর্পিত সম্পত্তি আইন, উত্তরাধিকার আইন) সেগুলো বাতিল করতে হবে।

(খ) ১৯৯৭ সালে স্বীকৃত ‘পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তিচুক্তি’র সব প্রস্তাব যথাযথ বাস্তবায়নে সরকারকে দৃঢ় ও দ্রুত ব্যবস্থা নিতে হবে, যাতে সেখানকার পার্বত্য সংখ্যালঘুদের মনে আস্থা ও শান্তি ফিরে আসে এবং জুম্ম জনগণের আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার প্রতিষ্ঠিত হয়।

(গ) দেশের সংবিধান অনুযায়ী যে কোন নাগরিকের দেশের যে কোন অঞ্চলে বাস করার অধিকার স্বীকৃত হলেও, সরকার এমন কোন পদক্ষেপ নেবে না, যাতে কোন অঞ্চলে, বিশেষ করে উত্তরাঞ্চলে আদিবাসী-অধ্যুষিত জেলাগুলোয়, সিলেটে মনিপুরী ও খাসিয়া জন-অধ্যুষিত অঞ্চলে, বৃহত্তর ময়মনসিংহের গারো এলাকায় এবং পার্বত্য চট্টগ্রামের জেলাগুলোয় জন-তাত্ত্বিক অনুপাতে দৃশ্যমান বৈষম্যের সৃষ্টি না হয় এবং স্থানীয় ও বহিরাগত সংকট দেখা না দেয়।

(ঘ) ১৯৯২ সালে ১৮ ডিসেম্বর জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদ কর্তৃক গৃহীত (৪৭/১৩৫ নং প্রস্তাবনা) ‘জাতিগত অথবা নৃতাত্ত্বিক, ধর্মীয় অথবা ভাষা-গত সংখ্যালঘু ব্যক্তিদের অধিকারের ঘোষণায়’ তাদের অধিকার রক্ষায় সদস্য রাষ্ট্রগুলোকে যেসব পদক্ষেপ নিতে বলা হয়েছে (অনুচ্ছেদ ১-৮), বাংলাদেশ সরকারকে সে ব্যাপারে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে এবং গৃহীত ব্যবস্থাদি সরকার জনসমক্ষে প্রকাশ করবে।

(ঙ) সংখ্যালঘুদের মধ্যে অপেক্ষাকৃত পিছিয়ে থাকা জনগোষ্ঠীর নিজস্ব ঐতিহাসিক, পারিবারিক ও উত্তরাধিকার নিয়ম-কানুন গুলোর স্বীকৃতিকে বৃহত্তর বাঙালি সংস্কৃতিতে আত্তীকৃত করে এই জনগোষ্ঠীভুক্ত জনমানুষের জাতীয় মূল স্রোতের অঙ্গীভূত করা, নিজেদের স্বকীয়তাকে বিসর্জন না দিয়ে_এই লক্ষ্যে সরকারকে নিশ্চিত পদক্ষেপ নিতে হবে।

(চ) জাতিসংঘ মানবাধিকার সর্বজনীন ঘোষণা কোন রাষ্ট্রের জাতিধর্ম-নির্বিশেষে নাগরিকের যেসব অধিকার (বিশেষ করে ধারা-৩ থেকে ৭, ১২, ১৬, ২০, ২১খ ধারায় বর্ণিত অধিকারগুলো) নিশ্চিত করা হয়েছে, তা রক্ষা করতে সরকারকে পদক্ষেপ নিতে হবে।

৫. (ক) সংখ্যালঘু জনগণের ওপর যে আক্রমণ সংঘটিত হয়েছে বা হচ্ছে, প্রকাশ্যে তার নিন্দা জ্ঞাপন করতে হবে।

(খ) অবিলম্বে সব শ্রেণীর সংখ্যালঘুদের ওপর যে কোন ধরনের নির্যাতন বন্ধ করা ও উপদ্রুত এলাকার নির্যাতনকারীদের, তাদের সামাজিক ও রাজনৈতিক অবস্থানে নির্বিশেষে উপযুক্ত বিচারের সম্মুখীন করাতে হবে।

(গ) সব শ্রেণীর সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর আক্রমণ ও নির্যাতন রোধ ও নিরাপত্তা-দানের জন্য পুলিশ ও জনপ্রশাসনকে দৃঢ় ও কার্যকর ব্যবস্থা নিতে বাধ্য করাতে হবে।

(ঘ) সিভিল ও পুলিশ প্রশাসনের যে ব্যক্তি বা ব্যক্তিদের সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা-দানে ব্যর্থ হয়েছে, তার বা তাদের বিরুদ্ধে কর্তব্য-চ্যুতির দায়ে কার্যক্রম গ্রহণ করা।

(ঙ) ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিদের উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ-দান সুনিশ্চিত করা।

৬. (ক) দেশের অভ্যন্তরে বাস্তু-চ্যুত ব্যক্তিদের পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করা।

(খ) দেশত্যাগীদের সুষ্ঠু পরিবেশে দেশে প্রত্যাগমন করিয়ে তাদের পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করা।

৭. অনতিবিলম্বে বাংলাদেশে প্রকৃত অর্থেই স্বাধীন ‘জাতীয় মানবাধিকার কমিশন’ গঠন সম্পূর্ণ-করণ। এ কমিশনের অবশ্যই ‘সংখ্যালঘু, নারী, শিশু-বিষয়ক’ পরিচ্ছেদগুলো বিশেষ গুরুত্ব পাবে এবং সব শ্রেণীর সংখ্যালঘু ও নারীদের প্রতিনিধিত্ব সুনিশ্চিত করতে হবে।

তবে এসব দফা কাগজে কলমেই থেকে যায়। কোন সরকার এসব দফা কার্যকর করতে উৎসাহী নয়। আশি ও নব্বরই দশকের বাবরি মসজিদের ঘটনার আগেও পরে বাংলাদেশে হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টানদের উপর সাম্প্রদায়িক ঝড় বয়ে গেলে এর উপর ‘গ্লানি (Glani)’ নামক একটি পুস্তক প্রকাশ করা হয় হিন্দু-বৌদ্ধ-ঐক্য পরিষদের উদ্যোগে। অদ্ভুত বিষয় হল এই বিষয়গুলো নিয়ে কথা উঠলে সবাই বলতে চেষ্টা করে যেহেতু ঘটনাগুলো এরশাদ ও বিএনপির আমলে ঘটেছে সেহেতু দায়টা তাদের। কিন্তু কেউ একটি বার প্রশ্ন করে না, হামলা থামানোর জন্যে কিংবা সমাজে শান্তি প্রতিষ্ঠার কোন উদ্যোগ কী তৎকালীন বিরোধী দলগুলো নিয়েছে? ইংরেজ শাসন আমলে আমরা দেখেছি; হিন্দু-মুসলিম দাঙ্গা থামানোর জন্যে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল বিভিন্ন কর্মসূচী হাতে নিয়েছে। গান্ধী নোয়াখালী’তে ভয়াবহ দাঙা থামানোর জন্যে এবং দাঙা পরিস্থিতি দেখার জন্য নোয়াখালীতে এসে হাজির হোন। আবুল কালাম আজাদ বিভিন্ন স্থানে বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণ করেন। এখন যদি প্রশ্ন করি; সেই সময় কোন কোন নেতা-নেত্রী দাঙ্গা থামানোর জন্য মাঠে নেমেছেন কিংবা কর্মীদের মাঠে নামার নির্দেশ দিয়েছেন তাহলে কী অন্যায় হবে? উল্টো আমরা বিভিন্ন সময় আমরা দেখতে পাই এসব হামলার সরকারী-বিরোধী দল সবাই মিলে-মিশেই হামলায় অংশ নেয়। কেউবা রাজনৈতিক ফায়দা হাসিল করার জন্যে হামলার তীব্রতার বাড়ানোর জন্যে নেতা-কর্মীদের হুকুম দেন। এসব হামলার করার মূল লক্ষ্য হল ভিন্ন সম্প্রদায়ের জমি দখলের সুযোগ। কয়েক বছর আগে প্রথম আলো পত্রিকা খবর প্রকাশ করে। সেখানে স্পষ্টভাবে দেখিয়ে দিচ্ছে যে; ‘সিলেটে ভিন্ন সম্প্রদায়ের জমি দখলের সবচেয়ে ভাল উপায় হল তাদের জমিতে মসজিদ তুলে দেওয়া।’ মসজিদ বানান হলে কেউ আর মসজিদ স্থানান্তরিত করার সাহস পায় না। ফলে প্রথমে মসজিদ, তারপর মাদ্রাসা এভাবেই ধীরে ধীরে ভিন্ন সম্প্রদায়ের জমি কেড়ে নেওয়া হচ্ছে। বাংলাদেশ রাষ্ট্রর চরিত্র সবসময় পাকিস্তান-মুখী ছিল। দ্বি-জাতী তত্ত্বের ভিত্তিতে দেশ ভাগের পর পাকিস্তানের আরেকটি অংশ হিসেবে পাকিস্তানের অধীনে স্বাধীন হয় বর্তমান বাংলাদেশ। পরবর্তীতে ১৯৭১ সালে সালে পাকিস্তানের থেকে মুক্ত করে নিজেকে আলাদা রাষ্ট্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে বাংলাদেশ। ভারত, পাকিস্তান, বাংলাদেশ এই তিন দেশের মধ্যে ভারত-বাদে দুই দেশের ক্ষমতার উপর ভর করে সামরিক শাসক গোষ্ঠী। পাকিস্তান আমলে ‘আহমদিয়া সমস্যা’ নামে মওদুদী একটি বই লেখেন। পাকিস্তান সরকার বইটি নিষিদ্ধ করার আগেই ১৮ দিনে বইটির ৬০ হাজার কপি বিক্রি হয়ে যায়। ১৯৫৩ সালের ১ ফেব্রুয়ারি পাঞ্জাবে মওদুদী আহমদিয়াদের বিরুদ্ধে লাহোরে হামলা শুরু করলেন। এর ফলে কয়েক হাজার আহমদিয়া হত্যার শিকার হয়। এর জন্য মওদুদীকে গ্রেফতার করে বিচার হোল এবং ফাঁসির আদেশ দেয়া হোল। পরে সৌদি আরবের হস্তক্ষেপে তার ফাঁসি রদ করা হয়। এখানে লক্ষণীয় বিষয় হল; ১৯৫৩ সালের ১ ফেব্রুয়ারি একজন আহমদিয়ার করব দেওয়াকে কেন্দ্র করে আহমদিয়াদের উপর অত্যাচারের সূত্রপাত হয় এবং আহমদিয়াদের হত্যা, তাদের বাড়িঘরে আগুন জ্বালানো থেকে শুরু করে লুটপাটের মতো ভয়াবহ রূপ লাভ করলে ৪ মার্চ পাকিস্তানে প্রথম আঞ্চলিক মার্শাল ল জারি হয়। মূলত এই দাঙ্গার কারণেই পাকিস্তানের সেনা বাহিনী প্রথম দেশ শাসনের স্বাদ গ্রহণ করে। বাংলাদেশে সামরিক শাসকরা ক্ষমতার স্বাদ পায় ১৯৭৫ সালের রক্তাক্ত ১৫ অগাস্টের পর। বঙ্গবন্ধুর হত্যার মধ্যে দিয়ে বাংলাদেশের রাজনীতিতে প্রকাশ্যে ডানপন্থীদের বড় আকারে আবার আগমন ঘটে। ১৫ অগাস্টের পর থেকে বিভিন্ন রূপে, বিভিন্ন উপায়ে রাষ্ট্রের ঘাড়ে সেনা বাহিনী ভর করতে শুরু করে। সাবেক সেনা বাহিনীর প্রধান এরশাদের স্বৈরাচারী জমানায়ও সাম্প্রদায়িক হামলা কিংবা পাহাড়ে আদিবাসীদের উপর হামলা থেমে থাকে নি।

বাবরি মসজিদের ভাঙার গুজবে এবং বাবরি মসজিদ ভাঙার পর ঠিক কতো মানুষ আক্রান্ত হয়েছেন, খুন হয়েছেন কিংবা কতো নারী নির্যাতিত হয়েছেন তার হিসেব বলা কঠিন। কারণ রাষ্ট্রীয়ভাবে সারা বাংলাদেশে কতো মানুষ আক্রান্ত হয়েছে এর কোন পরিসংখ্যান বের করা হয় নি। ফলে এখনে যা হাজির করব তা সামগ্রিক হামলার ক্ষুদ্র অংশ মাত্র। ভারতের ডানপন্থী গ্রুপ আর.এস.এস-এর নেতৃত্বে ১৯৯২ সালের ৬ ডিসেম্বর বাবরি মসজিদ ধ্বংস করে দেওয়া হয়। বারবি মসজিদ ধ্বংস আগেও বাংলাদেশে বাবরি মসজিদ ধ্বংস করার গুজব রটিয়ে অ-মুসলিমদের উপর হামলা করা হয়। ১৯৯২ সালের ৬ ডিসেম্বরের পর সারা দেশে বড় আকারে সাম্প্রদায়িক তাণ্ডব শুরু হয়। ৬ ডিসেম্বর থেকে ১৬ ডিসেম্বর পর্যন্ত ১৫ হিন্দু নারী-পুরুষ খুন হয়, ২৬০০ উপর নারী ধর্ষিতা হয়, ১০ হাজার মানুষ আহত হয়, ২ লক্ষ মানুষ গৃহহীন হয়, ৩৬০০ অধিক মন্দির জ্বালিয়ে দেওয়া হয়, ৪০ হাজার বাড়ি পুড়িয়ে দেওয়া ও দখল করা হয় এবং দশ হাজারের উপর হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের দোকান জ্বালিয়ে দেওয়া হয়। এটি শুধু ১০ দিনের চিত্র। এর মানে এই নয় যে দশ দিন পর সব স্বাভাবিক হয়ে গেছে কিংবা আর কোন সাম্প্রদায়িক হামলার হয় নি। পরবর্তীতে হামলা হয়েছে ধীরে ধীরে বিচ্ছিন্নভাবে। ঢাকা শহরে বড় আকারে হামলা হয় ৬ ডিসেম্বর ও ৭ ডিসেম্বর। ডানপন্থী ইনকিলাব পত্রিকা একটি নিউজ করে; ‘বাবরি মসজিদ ঘটনায় ঢাকার হিন্দুদের মিষ্টি বিতরণ!’ পরের দিন ভুল সংবাদের জন্য তারা ক্ষমা চায় কিন্তু যা হওয়ার এবং যে উদ্দেশ্যে এই সংবাদ করা হয়েছিল তা ঐ রাতেই সফল হয়। রাতের মধ্যে সকল হিন্দু পল্লীগুলো’তে আগুন লাগিয়ে দেওয়া হয়। ভুল সংবাদের জন্য ইনকিলাব পত্রিকার কোন বিচার কিংবা সরকার থেকে কোন মামলা কোনটাই হয় নি।বাংলাদেশে মিরসরাই, কুতুবদিয়া, মহেশখালী, ভোলা, মানিকগঞ্জ, চিটাগাং, সুনামগঞ্জ ইত্যাদি জায়গায় বড় হামলার ঘটনা ঘটে। অদ্ভুত বিষয় হল তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া টিভি’তে ভাষণ দেওয়ার সময় ভারতের বাবরি মসজিদ পুনরায় তৈরি করার আহবান জানালেও নিজ রাষ্ট্রের মানুষগুলোর অত্যাচারের কথা ও নিজের প্রশাসনের ব্যর্থতার কথা চেপে যান। বরং ভাষণে পরোক্ষভাবে বুঝিয়ে দিলেন যে; এসব হামলার ঘটনায় রাষ্ট্রীয়ভাবে কাউকে গ্রেফতার কিংবা মামলা হবে না। তাই পরবর্তীতে অমুসলিমদের উপর হামলার তীব্রতা লক্ষ্য করা যায়। পাহাড়েও বাঙালি সেল্টারা হামলা শুরু করে। সেখানে হিন্দু ধর্মাবলম্বী না থাকলেও তারা বৌদ্ধদের উপর হামলা করে। যেমনটি ১৯৭১ সালে পাকিস্তান সেনা বাহিনী সাঁওতালদের হিন্দু বিবেচনা করে গণহত্যা চালিয়েছিল সেই সম্প্রদায়ের উপর। সাম্প্রদায়িক হামলার গুজব রটিয়ে ১৯৯২ সালের এপ্রিল মাসে পাহাড়ে বাঙালি মুসলিমদের হামলায় ৬০০ আদিবাসী মারা পড়ে, ৪৫০০০ বৌদ্ধ আদিবাসী চট্টগ্রাম পাহাড় ছেড়ে ভারতের রিফিউজি ক্যাম্পে আশ্রয় নেয়। মজার বিষয় হলে মুসলিম সম্প্রদায় থেকে হামলার ঘটনায় আবার রাষ্ট্র-পক্ষ আসামী হিসেবে অমুসলিমদেরই গ্রেফতার করেছে। বাংলাদেশ রাষ্ট্র ও মিডিয়া বিষয়টি চেপে যাওয়ার ফলে আন্তর্জাতিকভাবে বিষয়টি প্রকাশ হয় নি।

২০০৭ সালের ভারতের গুজরাট হামলার ঘটনা আমরা জানি। সেই গুজরাট মতন হামলা ও হামলার ঘটনা বাংলাদেশে ঘটলেও মিডিয়া ও আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক কারণে তা ধামাচাপা পড়ে যায়। ফলে বাবরি মসজিদ, গুজরাট ইস্যু প্রতিবছর স্মরণ করা হলেও সাধারণ মানুষকে জানতে দেওয়া হয় নি কী হয়েছি বাবরি মসজিদ ঘটনার পূর্ববর্তী ও পরবর্তী বাংলাদেশের ইতিহাস।! রাজনৈতিক দলগুলো নিজেদের স্বার্থে ইতিহাস নিয়ন্ত্রণ করে অনেক সময় ইতিহাস জানতেও দেওয়া হয় না। তারপরও ব্যক্তিগত প্রচেষ্ঠায় সামান্য কিছু দলিল সংগহ করতে পেরেছি। সংগ্রহ করা ক্ষুদ্র অংশটি’র কিছু ছবি সবার সাথে শেয়ার করছি। ভবিষ্যতে যদি আরও কিছু দলিল পত্র পাওয়ার সুযোগ হয় তাহলে পোস্টটি আপডেট করা হবে।

১৯৮৮ সালে পাহাড়িতে নিয়ে রির্পোট। ২৮৭০ মানুষ রিফিউজি ক্যাম্পে মারা যায়।

 রিফিউজি সমস্যা। ৪৫ হাজার বৌদ্ধ ধর্মের মানুষ ভারতে আশ্রয় নেয়।

এক বছরে ২.৫ লক্ষ মানুষ ভারতে আশ্রয় নেয়।

চট্টগ্রামে হামলা

মিরসরাইতে হামলা।

সরকারী চাকুরীতে কী পরিমাণ ভিন্ন ধর্মের মানুষ ছিল তার রির্পোট

সিলেটে ধ্বংস হওয়া একটি মন্দির।

চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডে ১৯৯২ সালে।

পুড়ে যাওয়া একটি বাড়ি। ভোলা ১৯৯২।

সিলেটে অমুসলিমদের ধ্বংস হয়ে যাওয়া বাড়ি।

খুলনা ইমাম পরিষদ থেকে খুলনায় মন্দির আক্রমণের ছবি।

৪০ হাজার বাড়ির একটি যা সাম্প্রদায়িক হামলার আগুনে পুড়ে যায়।

গান্ধী আশ্রয়। কুমিল্লা ১৯৯২।

BM14

ঢাকার একটি ধ্বংস হওয়া মন্দির।

ধ্বংস হওয়া ঢাকেশ্বরী মন্দির। নভেম্বর ১৯৯০।

তথ্যসহায়তায়-
সাম্প্রদায়িকতা, রাজনৈতিক সহিংসতা এবং আমাদের করণীয়

-বিধ্বস্ত মানবতা (বইটি ২০০১ সালের নির্বাচন পরবর্তী ঘটনা নিয়ে)

Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s