মুসলিম দুনিয়ার ক্ষমতা সম্পর্কের ইতিহাস:জিহাদ ও খিলাফতের সিলসিলা

12802976_10153939949184134_2652082590312697748_n

নিজের ছায়ার ভয়ে দৌড়ানোর মতন একটি সংকটে পড়েছে বর্তমান বিশ্বের মুসলিম সমাজ। বিশ্বব্যাপী ইসলামিক উগ্রবাদ ও জঙ্গিবাদের শিকার খোদ মুসলিমরা হওয়া সত্ত্বেও তারা জঙ্গিবাদকে আদর্শিক-ভাবে মোকাবেলা করার ব্যর্থতা কিংবা জঙ্গি আদর্শের মুখোমুখি হওয়ার সাহসের অক্ষমতাকে লুকানোর জন্যে গড় বাধা কিছু বক্তব্য বরাবরের মতন প্রদান করে থাকে। তবে বক্তব্য দানের সাথে সাথে তারা এটিও উপলব্ধি করতে পারে যে এই বক্তব্যে মাধ্যমে ইহজগতের পুলসিরাত পার হওয়া সম্ভব নয়।

সমাজ কিংবা রাষ্ট্রে রাজনৈতিক কিংবা সামাজিক শক্তির যখন ভারসাম্য-হীনতা কিংবা প্রগতি চাকা যখন অচল হয়ে পড়ে তখন সামাজিক অস্থিরতা-বিদ্রোহ অনেক সময় ধর্মীয় চেহারায় প্রকাশ পায়। প্রতিটি সমাজেই ধর্মবাদী দলের সমর্থকের অবস্থান থাকলেও রাজনৈতিক শক্তি ও বিভিন্ন দেশের শক্তির মদতের উপর তাদের বিষধর ফণার নিয়ন্ত্রিত হয়। মধ্যপ্রাচ্য মার্কিন নীতির কারণে যেসব জঙ্গি-গোষ্ঠীর সৃষ্টি হয়েছে সেই জন্ম ইতিহাস স্বীকার করেও বলতে হবে এসব জঙ্গি-গোষ্ঠীর আদর্শিক অবস্থানও আছে। বন্দুকের নল ক্ষমতার উৎস কিন্তু সেই বন্দুককে মানুষের হাতে তুলে দেবার জন্যে আদর্শের প্রয়োজন হয়। আমরা উগ্রবাদী সংস্থার মদদদাতা খুঁজতে ব্যাকুল হলেও তাদের আদর্শিক জায়গাটিকে চ্যালেঞ্জ করতে উৎসাহী না। এর কারণ হয়তো আমাদের অক্ষমতা কিংবা পরকালের ভয়। ফলে মার্কিন নীতির ব্যর্থতা কিংবা পৃষ্ঠপোষকতায় ইসলামপন্থী জঙ্গি-দল সৃষ্টি হলেও সেই দল যোগ দিচ্ছে মুসলিম তরুণরা। আলকায়দা আমেরিকার তৈরি এসব কথা বলেও মুসলিম তরুণদের এসব সংগঠন থেকে দূরে রাখা সম্ভব হয়নি।

পারভেজ আলম-এর “মুসলিম দুনিয়ার ক্ষমতা সম্পর্কের ইতিহাস:জিহাদ ও খিলাফতের সিলসিলা ” বইটি পড়তে গিয়ে মনে হয়েছে- তিনি সততার সাথেই কোন এক উঁচু পাহাড়ের উপর দাঁড়িয়ে মুসলিম দুনিয়ার উত্থান-পতন, ক্ষমতার পালাবদল পর্যবেক্ষণ করে লিপিবদ্ধ করেছেন। ভারতের বারবি মসজিদ ভাঙার ঘটনাকে কেন্দ্র করে লন্ডনে হিজবুত তাহরি কীভাবে সংগঠিত হয়েছে সেই ইতিহাস আমরা দেখতে পাই মাজিদ নেওয়াজ-এর “রেডিক্যাল” বইটিতে। ঠিক কোন কোন প্রেক্ষিতে ধর্মীয় মতবাদগুলোর উদ্ভব ও বিকাশ হয়েছে, কীভাবে জনপ্রিয়তা লাভ করেছে তার একটা পরিষ্কার ইতিহাস পারভেজ আলম তার বইতে উপস্থাপন করেছেন।

বইটি যেহেতু মুসলিম দুনিয়ার ক্ষমতা সম্পর্কের ইতিহাস, সেহেতু নবী মুহাম্মদের মৃত্যুর পর থেকে ক্ষমতার জন্যে গোত্র লড়াই, ওসমানের কোরান সংকলন বিতর্ক থেকে শুরু করে সিরিয়ার ময়দানের আলীর যুদ্ধ শেষে ধর্মতত্ত্বের ইতিহাস, কাবা শরীফ ভাঙ্গার থেকে বর্তমান মধ্যপ্রাচ্যের শাসকদের অবস্থান ও সংকট সবকিছুই পাঠকের সামনে পরিষ্কারভাবে হাজির হবে। উপস্থাপনার ভঙ্গির জন্যে পারভেজ আলম প্রশংসার দাবী রাখেন।

যে কোন কোন মানুষের কাছেই হাজার বছরের পুরাতন স্মৃতি চিহ্ন গুরুত্বপূর্ণ হওয়া সত্ত্বেও কেন সৌদি শাসক নবী মুহাম্মদ তার পরিবারের কিংবা সাহাবীদের স্মৃতি চিহ্ন মুছে ফেলে, কোন মতবাদের ভিত্তিতে এগুলোকে শিরক মনে করে, আইএস কেন কালো পতাকা ব্যাবহার করে, কোন কথার ভিত্তিতে তারা অগুরুত্বপূর্ণ হওয়ার সত্ত্বেও সিরিয়ার দাবিক নামক স্থান দখল করে নিজেদের ম্যাগাজিনের নাম জায়গার নামে দাবিক রাখে এর সবগুলোর জবাব পারভেজ আলম তার বইতে উল্লেখ করেছেন।

বঙ্কিমচন্দ্র তার ‘আনন্দমঠ’ বইতে ভারতকে একটি হিন্দু রাষ্ট্র হিসেবে গড়ার কথা বলেন। পরবর্তীতে হিন্দুবাদী দলগুলো একই স্বপ্ন দেখা শুরু হরে। হিন্দুত্ব ও মুসলমানিত্ব দুটোই রাজনৈতিক দর্শন। ইসলামিক রাষ্ট্রও একটি আধুনিক রাজনৈতিক ধারণা। ইসলামিক রাষ্ট্রের কথা প্রথম বলেন পাকি-স্তানের মওদুদী। পরবর্তীতে এই ধারণা অনেকেই গ্রহণ করেন। আরবের ইসলাম কী করে সাম্রাজ্যবাদী ইসলামে পরিণত হয়ে শেষ জমানার যুদ্ধে অবতীর্ণ হয়েছে তার ধারাবাহিক ইতিহাস পারভেজ আলম উপস্থাপন করেছেন। এছাড়া বইটির মাধ্যমে বর্তমানে বহুল ব্যবহৃত শব্দ ‘সহি ইসলাম’-এর একটা ফয়সালা পাঠকের সামনে হাজির হবে।

পড়ার মাঝে আকস্মিক ইংরেজী শব্দের ব্যবহার হয়তো পাঠকের পড়ার গতিতে কিছুটা ভাঙ্গন ধরবে বলে মনে করি। আমাদের সমাজে ইসলামের ইতিহাস লিখের ক্ষেত্রে লেখকের এক ধরণের নিজস্ব মাস্তানি কিংবা নিজের মত চাপিয়ে দেওয়ার একটা প্রবণতা সবসময় লক্ষ্য করা যায় কিংবা বিরোধিতা করলে অনেক সময় ব্যক্তি আক্রোশটাই লেখার মধ্যে উপস্থিত হয়! সেই জায়গা থেকে বিচার করলে বইটি নিরপেক্ষ একটা অবস্থানে দাঁড়িয়ে আছে। তাকফিরি (নিজেদের ছাড়া অন্যদের মুসলিম না ভাবা, কিংবা কাফের হিসেবে ঘোষণা করা) চরিত্রের আস্তিক-নাস্তিকসহ সমাজের সকল শ্রেণির মানুষের জন্যে মুসলিম দুনিয়ার ইতিহাস জানতে ৩ অধ্যা-য়ের ২১৬ পৃষ্ঠার “জিহাদ ও খিলাফতের সিলসিলা” একটি চমৎকার বই। “জিহাদ ও খিলাফতের সিলসিলা” পাঠের মাধ্যমে জঙ্গিবাদের আদর্শিক অবস্থান, সামাজিক ধর্মীয় সংকট পাঠকের কাছে পরিষ্কার হবে এবং পাঠকের হৃদয়ে জায়গা পাওয়ার সাথে সাথে সামাজিক সচেতনতাও বইটি অবদান রাখবে বলে মনে করি।

Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s