সমকামীদের জন্যে গোপনে খুলছে মসজিদের দুয়ার

lgbt-in-islam-illustration-data

ছবি-http://www.abc.net.au/

অনেক ইমাম এখন সমকামী পরিচয়ে নিজেদের আত্মপ্রকাশ করছেন এবং প্রকাশ্যে তা স্বীকার করছেন এবং প্রচার করছেন; সমকামিতা ইসলামে নিন্দিত নয়। বিশ্বব্যাপী উদার নৈতিকতার ধাক্কায় তারাও কোরানের উদার ব্যাখ্যা হাজির করছে ও সংখ্যালঘু সমকামীদের মসজিদে আসার স্বাগতম জানাচ্ছেন।

এক.

আমির আহমেতোভিক প্রতিদিন পাঁচ-ওয়াক্ত নামাজ পড়েন এবং নিজেকে ধর্মপ্রাণ মানুষ হিসেবে মনে করেন। কিন্তু সামাজিক নিন্দাবাদের কারণে সে তার স্থানীয় ব্রিসবেন (Brisbane) মসজিদে বেশিদিন অংশগ্রহণ করতে পারেনি।

আহমেতোভিক বলেন, মুসলিম সমাজ সচেতন ছিল না যে আমি একজন সমকামী ব্যক্তি এবং আমি তাদের থেকে নিজেকে দূরে রাখতম। আমি খুব সীমিত পরিসরে তাদের সাথে যোগাযোগ রাখতাম। এটা আমার নিজের নিরাপত্তার স্বার্থে, কারণ আমি কোন ধরণের বৈরিতা, নেতিবাচক মন্তব্য শুনতে চাই না। ৩১ বছর বয়সী বসনিয়ার অধিবাসী আহমেতোভিক প্রায় এক যুগ আগে তার পরিবার থেকে বেরিয়ে আসেন, আর সেই অভিজ্ঞতাটি ছিল এক কঠিন অভিজ্ঞতায় পরিপূর্ণ। তার বাবা প্রাথমিকভাবে তাকে বর্জন করেন এবং শর্ত দেন- যদি সে তার যৌন বৈশিষ্ট্য গোপন রাখে তাহলে-ই তাকে গ্রহণ করা হবে।

আহমেতোভিক বলেন: বসনিয়ায় তিনি খুব কম সংখ্যক মুসলিম সমকামীকে জানি কিন্তু তারা আবার তাদের ধর্মীয় বিশ্বাস ত্যাগ করেছেন। আবার কিছু সমকামী মানুষকে জানি, যারা সমকামী এবং মুসলমান। তারা এমন মসজিদের সন্ধান করেন যেখানে তাদেরকে বাঁধা দেওয়া কিংবা পরিহার হবে না।

সম্প্রতি আহমেতোভিক মুসলিম ফর প্রোগ্রেসিভ ভ্যালু’র(Muslims for Progressive Values ,MPV) ব্রিসবেন শাখায় যুক্ত হোন, যা ২০০৭ সালে নিউ ইয়র্ক সিটিতে যাত্রা শুরু করে। সংগঠনটির লক্ষ্য-আল-কায়দা, ওহাবী মতবাদ এবং গোঁড়া ইসলামিক সমাজের বিরুদ্ধে একটি প্রগতিশীল ইসলামিক ব্যাখ্যা নির্মাণ করা।

 

7341224-3x4-340x453

ছবি- আমির আহমেতোভিক। যিনি নিজেকে ধমপ্রাণ মুসলমান বলে বিশ্বাস করেন।

MPV সমাজের বৈচিত্র্যতা নির্মাণ, লিঙ্গের সমঅধিকার (লিঙ্গ বৈষম্যহীন মসজিদ) এবং সমকামীদের অন্তর্ভুক্ত করার জন্যে প্রচার চালায়। বর্তমানে সারা পৃথিবীতে তাদের হাজার হাজার সদস্য রয়েছে। শুধু মাত্র গত বছর অস্ট্রেলিয়ায় তারা জনপ্রিয়তা পায়। মেলবোর্নে, সিডনি ও ব্রিসবেন-এ তারা সাব-ব্রাঞ্চ খুলতে যাচ্ছে।

সিডনি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক সাহের আমির ও ডিকিন বিশ্ববিদ্যালয়ের রিম সুয়েডের নেতৃত্বে স্থানীয় MPV আন্দোলন করে; তারা দাবি করেন, “অস্ট্রেলিয়ায় পশ্চিমা বিশ্বে বসবাসরত সবচেয়ে বেশি মাত্রায় রক্ষণশীল মুসলমানের বাস।”

দুই.

মেলবোর্নের ইমাম নূর ওয়াসিম বড় একটি পদক্ষেপ গ্রহণ করেন। নূর তার ধর্ম সভায় মুসলিম বিশ্বাসের জায়গা থেকে সমকামীদের পক্ষে তার নিজস্ব উদার-নৈতিক ইসলামিক ব্যাখ্যা হাজির করেন। ইমাম নূর সোমালিয়ায় জন্মগ্রহণ করেন, শিশু বয়সে ইজিপ্ট, কানাডায় ছিলেন এবং হাই স্কুল ছাত্রাবস্থায় বেলবোর্নে চলে আসেন। ১৩ বছর ধরে তিনি ইমামের কাজ করছেন এবং তিনি ভিক্টোরিয়ায় শহরের দ্বিতীয় ইমাম, যিনি কোরানে হাফেজ। হাফেজ হওয়ার অর্থ তিনি কোরানকে সম্পূর্ণভাবে মুখস্থ করতে সক্ষম হয়েছেন। ইমাম নূর এবিসি নিউজকে বলেন-আমার জীবনের উপর হুমকি আছে কারণ অবশেষে আমি বলতে শুরু করেছি।

নূর বলছেন-এই বছরের শুরুতে যখন আমি যখন মেলবোর্নের জয় রেডিও এফএম স্টেশনে সমকামীদের পক্ষে কথা বলি, এরপর দুই জন লোক (যারা মুসলিম সমাজের এবং পরিচিত) আমার মেলবোর্নের বাড়িতে এসে তাকে হুমকি দিয়ে যায়। আমি যেন সমকামীদের পক্ষে কথা বলা বন্ধ করে দিই তারা এটি চাচ্ছিল। সৌভাগ্যবশত ভিক্টোরিয়ার পুলিশ খুবই সাহায্যকারী তার কারণে আমি এখনো ঠিক আছি।

 

7345148-3x2-940x627

ইমাম নূর

দুই বছরের আগে নূর মেলবোর্নের প্রাচীর সীমানার মধ্যে একটি গোপন সাপোর্ট গ্রুপ “মারহাবা” (স্বাগতম) চালু করেন।

নূর বলেন-যখন আমি এই গ্রুপ শুরু করি তখন আমি জেনে-বুঝেই করছি যে আমি একটি আত্মঘাতী মিশনে আছি। কিন্তু আমি আশাবাদী ও সতর্ক একজন মানুষ। আমি নিজের খেয়াল রাখতাম এবং এর জন্যে যদি আমার মৃত্যুও হয় তার জন্যে আমি প্রস্তুত ছিলাম। নূর আরো বলেন-যদিও LGBT কিংবা সমকামীদের প্রতি আন্তরিক এমন মসজিদ ও প্রার্থনার ঘর দক্ষিণ আফ্রিকা, ফ্রান্স, আমেরিকা এবং কানাডায় (১৯৯০ এর শেষের দিকে) কিন্তু অস্ট্রেলিয়াতে এটি প্রথম মসজিদ। আমি মূলধারার রক্ষণশীল মুসলিম সংস্থাগুলোর সাথে যুক্ত করতে চাই না। কারণ তারা সমকামী সম্প্রদায়ের অনেক ক্ষতি করেছে।

আমি একজন সহানুভূতিশীল স্বাধীন ইমাম হিসেবে পরিচিতি পেতে চাই। আমার সারা জীবনের প্রার্থনা যুব সমাজ, সমকামী মুসলিমদের সাহায্য করা; যারা অস্ট্রেলিয়ার ধর্মীয় নেতাদের ভয়ে ভীত।

পরিবার থেকে বের হয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্তে জীবনের ঝুঁকি থাকে:

সম্প্রতি এক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে অস্ট্রেলিয়ার ২.২% অর্থাৎ ৫ লক্ষ মানুষ মুসলিম পরিচয় বহন করে।ইমাম নূর বেলবোর্নের একটি হাসপাতালে প্রথম ধর্মযাজক সংক্রান্ত কর্মী হিসেবে কাজ করেন।২০০৩ সাল থেকে আলফ্রেড হাসপাতালে তিনি কাজ করছে।

নূর বলেন- দুই বছর আগে, মেলবোর্নে দুই জন লোক HIV-পজিটিভে মারা যায়। তাদের সৎকারের জন্যে কোন মসজিদ আগ্রহী হয়নি। বিষয়টি আমাকে খুব নাড়া দেয়। আমাদের জীবন ও মরার মধ্যেও এক ধরনের সামাজিক কলঙ্ক থাকে।

ইমাম নূর ও মৃত মানুষগুলো পরিবার মিলে তাদের সৎকার করে এবং ইসলামিক রীতি-নীতি অনুযায়ী তাদের জন্যে প্রার্থনা করেন। হাসপাতালের বাহিরে তিনি অতিরিক্ত সময় দেন। তার গ্রুপ সদস্যদের সাথে মাসিক বৈঠক সেখানে ১৬ বছরের তরুণরাও থাকে। তারাও বছরে দুই বার ঈদ উৎসব উদযাপন করে।

ইমাম নূর বলেন, সমগ্র অস্ট্রেলিয়ায় ‘মারহাবা’য় প্রায় ৫০০ জন সদস্য আছে। এবং প্রতিনিয়ত সদস্য সংখ্যা বাড়ছে। ফেসবুকে তাদের কার্যক্রম প্রচারের জন্যে পেইজ ও গ্রুপ আছে। ফেসবুক গ্রুপের প্রায় ১০০ জনের সাথে তার সাক্ষাৎ হয়েছে। এছাড়াও নূর স্থানীয় ও সরকারের সহায়তায় একটি নিরাপদ বাড়ি বানাচ্ছেন সেই সমস্ত ছেলেদের জন্যে যারা তাদের পরিবার ও সমাজ থেকে বিচ্যুত কিংবা ঐ সমাজ থেকে বের হয়ে এসেছে। আশা করা যাচ্ছে এই বছরের শেষে মেলবোর্নের বাড়িটি সবার তাদের জন্যে খুলে দেওয়া সম্ভব হবে।

এবিসি নিউজকে নূর বলেন, সম্প্রতি সে এক মুসলিম তরুণকে আশ্বস্ত করেছি; পরিবার থেকে বের হয়ে আসার জন্যে আমার মনো-বৈজ্ঞানিক পরামর্শ নেওয়ার প্রয়োজন নেই যতক্ষণ পর্যন্ত সম্পূর্ণভাবে ‘সেফ হাউজ’ নির্মাণ না হচ্ছে।

নূর জানুয়ারি মাসে এফএম জয়’তে বলেন, মুসলিম ঐতিহ্য অনুযায়ী, পরবার থেকে বের হয়ে আসার ফল একটি সময়ের জন্যে বেশ ঝুঁকিপূর্ণও বটে। এবিসি নিউজ সাতজন ধর্মীয় নেতার সাথে-যোগাযোগ করে কিন্তু কেউ মুসলিম সমাজের সমকামিতার বিষয়ে কথা বলতে মন্তব্য করতে রাজি হয়নি। এমনকি MPV কিংবা ‘মারহাবা’ সাথেও তারা তাদের চিন্তা-ভাবনা শেয়ার করেনি। ভিক্টোরিয়া ইসলামিক কাউন্সিল এই বিষয়ে মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানায়।

সমকামী ইমাম কী ধর্মীয় বক্তব্য দেওয়ার বৈধতা রাখে?

কিন্তু কীভাবে ইমাম নূর একজন ধর্মীয় ও সমকামী নেতা হতে পারেন? যেখানে সমকামিতাকে মুসলিম দেশগুলো একটি বড় অপরাধ হিসেবে চিহ্নিত করে! এমনকি সৌদি আরব, ইজিপ্ট, ইরান, সংযুক্ত আরব আমিরাত এই অপরাধের শাস্তি মৃত্যুদণ্ড। এমনকি সিরিয়ায় সৃষ্টি হওয়া ইসলামিক স্টেট এই অপরাধের জন্যে ভবনের উপর থেকে সমকামীদের ছুড়ে ফেলে দিয়ে হত্যা করছে।

7345122-3x4-340x453

ছবি-আমেরিকার প্রথম সমকামী ইমাম, আবদুল্লাহ। যিনি বলেন, কোরানে সমকামীতাকে অপরাধ হিসেবে উল্লেখ করা নেই।

যদিও, সমকামীদের নিয়ে কোরানে কোন কিছু উল্লেখ নেই। ইসলামিক পরিভাষায় একটি বিশ্বাস হল; সমকামিতা একটি অশ্লীল কাজ, অস্বাভাবিকতা কিংবা লুত নবীর আমলের মানুষের আচরণ।

আমেরিকার প্রথম সমকামী ইমাম আব্দুল্লাহ হওয়ার ফলে একটি ভিন্ন ধরনের চিন্তার জাগরণ ঘটছে। ইমাম আব্দুল্লাহ সারা পৃথিবী ব্যাপী অনেক সমকামী ইমামদের সাথে পরিচিত হোন। তিনি বলেন- আমি ১২ জন সমকামী ইমামের সাথে সাক্ষাৎ করেছি যাদের মধ্যে ১২ জন ভিন্ন দেশের যেমন- জাকার্তায়, মেলবোর্ন, দুবাই, কেপ টাউন, লন্ডন, বেইজিং, আমস্টাডাম ও দক্ষিণ আমেরিকার।

প্রায় ১২ বছরের উপর আবদুল্লাহ নিজেকে স্বঘোষিত ইমাম দাবী করে আসছেন এবং মুসলিম সমাজ থেকে নিয়মিত মোবাইল ও ই-মেইলে হুমকি আসছেন। এছাড়াও অন্যান্য মুসলিম নেতা ও ইমামদের থেকে উপেক্ষিত হয়ে আসছে।

কোরানে সমকামিতা:

আব্দুল্লাহ বলেন, কোরানে সমকামিতাকে কোন ভাবেই অপরাধ হিসেবে চিহ্নিত করেনি।  যদিও এমন বক্তব্যে অস্ট্রেলিয়া ফেডারেল ইসলামিক কাউন্সিল হতে বাতিল হয়েছে।ইসলামিক কাউন্সিলের কায়েস তাদ বলেন-ইসলামের সমকামিতা নিয়ে স্পষ্টভাবে বলা আছে। সমকামিতাকে অমার্জনীয় অপরাধ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।

যদিও ইমাম আবদুল্লাহ এবং অস্ট্রেলিয়ার ইমাম নূর প্রথম-সারির কোন ইসলামিক সংস্থা থেকে কোন ধরণের আর্থিক সাহায্য নেয় না বরং তাদের মিথ্যাবাদী হিসেবে চিহ্নিত করলেও তাদের ইমাম টাইটেল কেড়ে নিতে এখনো পারেনি।

2090014-3x2-340x227

ছবি-কায়েস তাদ


আটলান্টার ইমোরি ভার্সিটির ‘মধ্য ইস্টার্ন ও দক্ষিণ এশিয়া’ বিভাগের অধ্যাপক ড. স্কট সিরাজ আল-হক কুঙ্গলে দীর্ঘদিন ধরে ‘ইসলামের মধ্যে যৌনতার অন্বেষণ’ বিষয়ে কাজ করে আসছেন। ড. কুঙ্গলে বলেন, একজন মানুষকে ইমাম হতে গেলে কোরান বিষয়ে তার অধিক পড়াশুনার প্রয়োজন রয়েছে। যাতে সে তার কমিউনিটিকে কোরান বিষয়ে বয়ান ও নামাজ আদায় করার নেতৃত্ব দিতে পারে।যদিও আব্দুল্লাহ ও ইমাম নূরের সাথে কিছু বিষয়ে তার অমত রয়েছে।

ড. কুঙ্গলে বলেন, কোন ক্যাথলিক গির্জা বা ইসলামের ধর্মযাজকরা, উদাহরণ স্বরূপ ইসলামের সুন্নি মতলম্বিরা খুবই বিকেন্দ্রীয় একটি সম্প্রদায়। ইসলাম ধর্মের বিধান অনুসারে কাউকে অযাজনীয় তথা ধর্মচ্যুত ঘোষণা করা যায় না। এই ধরণের বিধান ইসলামে নেই।”

মিস্টার তাদ এবিসি নিউজকে বলেন, মসজিদের প্রবেশের সময় কাউকে এসবের জন্যে পরীক্ষা করা হয় না। মসজিদে প্রবেশের সময় কেউ কাউকে জিজ্ঞেস করে না, তুমি কী সমকামী অথবা অন্যকিছু। আমরা মানুষের যৌনতাকে তার ব্যক্তিগত বিষয় মনে করি। আমরা মসজিদে কাউকে নিষিদ্ধ করি না।

 

 

মূল খবরের লিংক-The secret mosques opening their doors to gay Muslims

Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s