আলোচিত সেই হিটলিস্ট যেভাবে তৈরি হয়

57

যে কোন বিষয়কে রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গিতে দেখা জরুরী। কারণ বর্তমান বাংলাদেশে যে বিরোধ তা শুধু আস্তিক-নাস্তিক কিংবা ইসলামপন্থী-উদারপন্থীদের মধ্যে বিরোধী হিসেবে দেখলে চলবে নাহ। রাষ্ট্রের ও রাজনৈতিক দলগুলোর ক্ষমতার কায়েমী স্বার্থগুলো ভুলে গেলে চলবে নাহ। ইউরোপে প্রথম দিকে খ্রিস্টানদের মারা হতো নাস্তিক ও অবিশ্বাসীর অভিযোগে আবার খ্রিস্টানরা যখন ক্ষমতায় আসলো তারাও একই কাজ করে। সমস্ত ইউরোপজুড়ে শিকলের মতন বসানো হয়েছিল অসংখ্য ইনকুইজিশন। ধর্মদ্রোহী কিংবা নাস্তিকতার অভিযোগ যে একটি রাজনৈতিক অভিযোগ তার উদাহরণ হল-খলিফা মুতাওয়াক্কিলের মদ্যপ হতে তার ইমান বাধ সাধেনি কিন্তু মুতাজিলাদের কিংবা আরব দার্শনিক আল কিন্দিকে মেনে নিতে বাধ সেধেছে।বাংলাদেশে বর্তমান যে ধর্মীয় ইস্যু সেটি বিচার করতে গেলেও আমাদের রাজনৈতিকভাবে বিচার করতে হবে। তবে এখানে সেই আলোচনায় যাচ্ছি না। এখানে লিখব-রাজনৈতিক স্বার্থে কীভাবে হিটলিস্ট তৈরি করা হয়েছে বাংলাদেশে।

ধারাবাহিকভাবে বাংলাদেশে ব্লগার ও অনলাইন এক্টিভিস্ট খুন হওয়ার ঘটনায় প্রেক্ষিতে বারে বারে আলোচনায় আসছে ২০১৩ সালের সেই ৮৪ জনের লিস্ট। কেন, কীভাবে, কোন প্রেক্ষিতে এই হিট-লিস্ট করা হয়েছে কারা করেছিল? কারা করেছিল সেই লিস্ট? এই প্রশ্নগুলোর উত্তর অনেকের হয়তো জানা নেই।

কাদের মোল্লার সর্বোচ্চ সাজা ‘ফাঁসি’র দাবীতে ৫ ফেব্রুয়ারি শাহবাগে জড়ো হয় অনলাইন এক্টিভিস্ট ও ব্লগার কমিউনিটি। ফাঁসির দাবীতে শাহবাগ যখন তুঙ্গে, মিডিয়ায় কল্যাণে ব্লগার নামটি যখন জনপ্রিয়তা পায় ঠিক তখন খুন হোন রাজীব হায়দার। ১৫ ফেব্রুয়ারি, জঙ্গিদের হাতে খুন হওয়ার পর বর্তমান প্রধানমন্ত্রী ও তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহীউদ্দীন খান আলমগীর রাজীবের বাসায় যান। রাজীব হায়দার শাহবাগে জড়ো হওয়ার লক্ষ লক্ষ মানুষের মতন শাহবাগের একজন সমর্থক ও কর্মী ছিলেন। শাহবাগ আন্দোলনের সময় শুধু রাজীব হায়দার নন পরবর্তীতে খুন হোন আরো অনেকে। এর মধ্যে রাজাকার গোলাম আযমের সাক্ষী গীতিকার ও গীতিকার আহমেদ ইমতিয়াজ বুলবুলের ভাই মিরাজ আহমেদ হত্যা অন্যতম। প্রাথমিকভাবে রাজীব হায়দার খুনের ঘটনায় জামাত-শিবিরের সম্পৃক্ততা মনে করা হলেও পরবর্তীতে দেখা গেল তিনি খুন হয়েছেন তার নিজের লেখালেখির কারণে। খুনিরা আনসার বাংলা নামে একটি জঙ্গি সংগঠনের সদস্য। প্রধানমন্ত্রী যেহেতু নিহত রাজীব হায়দারকে দেখতে গিয়েছেন এবং ব্লগার পরিচয়টি যখন মানুষের মনে নতুন জনপ্রিয় শব্দ তখন বিএনপির মুখপত্র ‘আমার দেশ’ পত্রিকাসহ আরো অনেক ডানপন্থী পত্রিকা রাজীবের ব্যক্তিগত বিশ্বাস ‘নাস্তিক’ পরিচয়টি হাইলাইট করে তার লেখালেখি পত্রিকা ও অনলাইনে প্রকাশ করে। এখানে স্মরণ রাখা প্রয়োজন; শাহবাগ সৃষ্টি হওয়ার পরপর-ই জামাতের সাথে বিএনপির সম্পর্ক থাকায় তৎকালীন বিরোধী দলীয় নেত্রী বেগম খালেদা জিয়া ব্লগারদের বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে অবস্থান নেন। ব্লগার রাজীব হায়দার খুন, শাহবাগে রাজীবের জানাজা অনুষ্ঠিত হওয়ার পর হেফাজত ইসলাম নাস্তিক ও ব্লগ ইস্যুকে সামনে রেখে রাস্তায় নামে। ইসলামপন্থী দল গুলোসহ অন্যরা পেছনে থাকলেও মূল ভূমিকায় থাকে হেফাজতে ইসলাম। ২০১০ সালে নারী নেতৃত্বের প্রতিবাদে হেফাজত ইসলামের সৃষ্টি। ২০১৩ সালে ব্লগার ইস্যুতে তারা মাঠে নামে। হেফাজত অভিযোগ করে শাহবাগের ব্লগাররা ইসলাম ও নবীর বিরুদ্ধে লেখালেখি করে। এক দিকে শাহবাগ অন্যদিকে হাটহাজারির হেফাজতের আন্দোলন সৃষ্টি হওয়ার ফলে ঢাকার রাজাকারের ফাঁসির ইস্যুটি চট্টগ্রামে নাস্তিক ফাঁসির ইস্যুতে রূপ নেয়। জাতির মধ্যেও স্পষ্টভাবে বিভক্তি হাজির হয়।

ব্লগাররা ইসলাম নিয়ে কটূক্তি করে এমন অভিযোগের ভিত্তিতে মার্চ মাসে সরকার কটূক্তিকারী ব্লগারদের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নেবে বলে বিবৃতি দেয়। প্রাথমিকভাবে বিটিআরসির সহায়তায় complainmoha@gmail.com নামে একটি মেইল ওপেন করে। যেখানে ব্লগারদের কটূক্তি কিংবা ইসলাম অবমাননার তথ্য দিতে বলা হয়। তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব মাইনউদ্দিন খন্দকার সাংবাদিকদের বিষয়টি নিশ্চিত করেন। তিনি আরো বলেন-“ইসলাম ধর্ম ও মহানবীকে নিয়ে যারা আপত্তিকর মন্তব্য করে তাদের বিরুদ্ধে তথ্য চাওয়া হয়েছে আলেম সমাজের কাছে। ইতোমধ্যে বেশ কয়েকটি অভিযোগ জমা পড়েছে। এগুলো দ্রুত আইন সংস্থাকারীর কাছে পাঠানো হবে অনুসন্ধানের জন্যে পরবর্তীতে তাদের বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপ দেওয়া হবে।”

প্রাথমিকভাবে এসব ব্লগারদের শনাক্ত করতে সরকার ৯ সদস্যের একটি কমিটি গঠন করে। ৩১ মার্চ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রণালয়ে সেই কমিটির সাথে আলেম সমাজ বৈঠক করে এবং ৮৪ জন ব্লগারের লিস্ট জমা দেয়।২ ইতোমধ্যে খুন হওয়া রাজীব হায়দারের নাম সেই তালিকাতেও আছে। রোববারের সেই বৈঠকে ব্লগারদের বিরুদ্ধে রাষ্ট্র পক্ষ থেকে মামলা করে কঠোর শান্তি দেয়ার সুপারিশ করা হয়। ইসলামী চিন্তাবিদ ও আলেমদের সঙ্গে বৈঠকে এ সুপারিশের প্রেক্ষিতে কমিটির সভাপতি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব মাইনউদ্দিন খন্দকার বলেন, “তওবা পড়ার সুযোগ দেয়া যেতে পারে, এর পরও তারা এ অপপ্রচার চালালে কঠোর ব্যবস্থা নেয়া হবে।” এছাড়া তওবা করানোর বিষয়ে সায় দিয়েছিল প্রধানমন্ত্রী কার্যালয়ে গঠিত তৎকালীন তদন্ত কমিটি।

বৈঠকের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ৩১ মার্চ রাতে ৩ জন ব্লগারকে নিরাপত্তার স্বার্থে বৈঠকের কথা বলে ডিবি অফিসে নিয়ে যায় ডিবি পুলিশ। হেফাজত ইসলামের দাবী অনুসারে ও ইসলামপন্থী দলগুলোকে খুশি করার লক্ষ্যে ব্লগার ও তাদের পরিবারের নিরাপত্তার কথা বিবেচনায় না এনে সরকারের নির্দেশে ডিবি পুলিশ ১ এপ্রিল টিভি-মিডিয়া ডেকে মশিউর রহমান বিপ্লব, রাসেল পারভেজ, সুব্রত শুভ’কে গ্রেফতার দেখায়। পরবর্তীতে ৩ এপ্রিল গ্রেফতার করা হয় আসিফ মহিউদ্দীনকে। ২ এপ্রিল আইন ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী যৌথ সংবাদ সম্মেলনে আইনমন্ত্রী শফিক আহমেদ বলেন, “ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাতকারী সবাইকে আইনের আওতায় এনে শাস্তি দেওয়া হবে। এ জন্য প্রচলিত দণ্ডবিধি পরিবর্তন করে সাজা বাড়ানোর চিন্তাভাবনা করা হচ্ছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহীউদ্দীন খান আলমগীর বলেন, যারা ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত হেনে কিছু করছে, তাদের বিরুদ্ধে দণ্ডবিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”

এভাবেই ইসলামপন্থীদের দাবীর মুখে ও সরকারের আদেশেই ব্লগারদের লিস্ট তৈরি হয়। সেই লিস্টের প্রেক্ষিতেই ৪ জন ব্লগারকে গ্রেফতার করা হয়। যদিও সেই সময় সেই লিস্টের সূত্র ধরে আরো অনেককে গ্রেফতারের চেষ্টা চালায় ডিবি পুলিশ। পরবর্তীতে ইসলামিক জঙ্গিদের হাতে নিহত হওয়ার ব্লগারদের অনেকেই এই লিস্টে ছিলেন। যদিও এই লিস্টের বাহিরেও অনেক ব্লগার ও অনলাইন এক্টিভিস্ট খুন হয়েছেন। তারপরও এই লিস্টের কারণে ব্লগারদের একাকি কিংবা পরিবারসহ দেশ ত্যাগ করতে হয়েছে। এই লিস্টের সবাই যেহেতু নাস্তিক খেতাব পেয়েছে সুতরাং জঙ্গিদের সহজ টার্গেট হয়েছে লিস্টের ৮৪ জন। যা এখন হিটলিস্ট হিসেবে সবার কাছে পরিচিত। তাই এই লিস্ট শুধু ইসলামিক দলগুলো বানিয়েছে কিংবা শুধু সরকার বানিয়েছে এমনটি বলার সুযোগ নেই। বরং ইসলামিক দলগুলো ও সরকারের আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী প্রতিষ্ঠান মিলেই এই লিস্ট তৈরি করে ২০১৩ সালের মার্চ মাসের শেষের দিকে। যা এখন বিশ্বে আলোচিত ৮৪ জনের হিটলিস্ট হিসেবে পরিচিত। আর এই হিটলিস্টের কারণে আর্থিকভাবে ক্ষতিসহ স্বাভাবিক জীবন হারিয়েছে অসংখ্য ব্লগার।

তথ্যসূত্র:
১. ইসলাম ধর্মের সমালোচনাকারীদের বিষয়ে তথ্য দিতে আহবান-দৈনিক যুগান্তর
২. স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে ৮৪ ব্লগারের নথি জমা-নতুনবার্তা
৩. নাস্তিক ব্লগারদের তওবার দাবিতে সায় কমিটির-বাংলা বিডিনিউজ২৪.কম
৪. ইসলাম অবমাননার অভিযোগে তিনজন ব্লগার গ্রেফতার-বিবিসি
৫. আইন ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর যৌথ সংবাদ সম্মেলন: ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাতকারীদের শাস্তি দেবে সরকার-প্রথম আলো

 

Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s