‘অপারেশন থান্ডারবোল্ট’ সফলতার ফাঁকা বুলি!

daily-sun-gulshan-attack-pic-41

আহত পুলিশ

গত ১ জুলাই ২০১৬ রাতে রাজধানীর কূটনীতিক পাড়ার গুলশানে হলি আর্টিজেন বেকারিতে ঢুকে বিদেশিসহ বেশ কয়েকজনকে জিম্মি করে ইসলামিক জঙ্গিরা। রাত প্রায় ৯টায় জঙ্গিরা রেস্টুরেন্টের বিদেশীসহ সবাইকে জিম্মি করে। রাতের মধ্যেই বিদেশী ২০ জনকে জবাই করে হত্যা করে জঙ্গিরা এবং নিহতের ছবি ঐ রাতেই আইএস তাদের সাইটে প্রকাশ করে। নিহতদের এর মধ্যে ৩ জন বাঙালিও ছিলেন। শুক্রবার রাতে ২ জনকে উদ্ধার করতে সক্ষম হয় আইন শৃঙ্খলা বাহিনী/ কিংবা তারা পালিয়ে আসতে সক্ষম হয়। পুলিশের সদস্যরা ভাবেনি জঙ্গিরা এতোটা ভয়াণকভাবে রেস্তোরাঁয় অবস্থান নিয়েছে। তাই যথেষ্ট শক্তি না নিয়ে প্রতিরোধ করতে গেলে জঙ্গিদের আক্রশনে ১০ জনের বেশি পুলিশ সদস্য আহত হয়।

কলকাতার ABP আনন্দ পত্রিকা দাবী করেছে- একবার নয়, গুলশনে জঙ্গি হামলা হতে পারে বলে বারবার ঢাকাকে সতর্ক করে দিল্লি। সতর্কবার্তা এসেছিল আমেরিকার কাছ থেকেও। কিন্তু সেই সাবধানবাণী অবহেলার মাশুল মর্মান্তিকভাবে চোকালেন ২০জন পণবন্দি। সোশ্যাল মিডিয়ায় জঙ্গিরা ডিপ্লোম্যাটিক জোনে হামলার ছক নিয়ে পোস্টও করেছিল। কিন্তু বাংলাদেশি গোয়েন্দারা গুরুত্ব দেননি তাতে।

শুক্রবার রাতেই জঙ্গিদের পক্ষ থেকে ৩টি দাবীর কথা পত্রিকা (বাংলা ট্রিবিউন) ও টেলিভিশন মিডিয়ায় (ইন্ডিপেন্ডেন্ট) এর প্রকাশিত হয়। যদিও এই তিন দাবীর কোন ভিত্তি কিংবা সত্যতা কেউ দেখাতে পারেনি। পরবর্তীতে এই দাবীগুলো যে ভিত্তিহীন তা প্রমাণিত হয়। জঙ্গিরা সেখানে মানুষকে খুন করতে গিয়েছে কোন দাবী আদায়ের জন্য যায় নাই।

বাংলাদেশী তিনজনকে হত্যা করার মূল কারণ তারা কোরানের কোন সুরা বলতে পারে নাই। ডেইলি স্টার বলছে, জিম্মিদের মধ্যে যারা কোরানের আয়াত আবৃত্তি করতে পেরেছে তাঁদেরকেই কেবল বাঁচিয়ে রেখেছে সন্ত্রাসীরা। বাকিদের ভাগ্যে কি ঘটেছে জানা যায় নি। বেঁচে যাওয়া এক নারী বলেছেন; তিনি হিজাব পরা থাকায় তিনি বেশ আদর যত্ন পান! সুতরাং বাংলাদেশী তিনজন নিহত হয়েছেন তারা সুরা বলতে না পারায়। বিদেশীদের মধ্যে এক শ্রীলংকান ও এক জাপানি নাগরিককে জঙ্গিরা হত্যা করেনি।

শনিবার সেনা সদর দপ্তরে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর মিলিটারি অপারেশনসের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল নাঈম আশফাক চৌধুরী বলেন-“একজন জাপানি ও দুজন শ্রীলঙ্কানসহ ১৩ জনকে জীবিত উদ্ধার করা হয়েছে। অভিযানে সাতজন সন্ত্রাসীর মধ্যে ছয়জন নিহত হয় এবং এক সন্দেহভাজন সন্ত্রাসীকে গ্রেপ্তার করা হয়। এ ছাড়া অভিযান শেষে তল্লাশিকালে ২০ জনের মৃতদেহ উদ্ধার করা হয়। যাদের সবাইকে গত রাতেই ধারালো অস্ত্র দিয়ে হত্যা করা হয়।”

সুতরাং যারা প্রশ্ন তুলেছিল সিএনএন ছবি পেল কীভাবে (নিজেরা বকলম তাই অন্যদের তাই ভাবে) হত্যার তথ্য বিদেশীরা জানল কিভাবে তাদের প্রশ্নের উত্তর আগেই উল্লেখ করা হয়েছে এবং গতরাতেই যে হত্যা করা হয়েছে তা অপারেশনসের পরিচালকও স্বীকার করলেন। এবার আসি উদ্ধার প্রসঙ্গে; ১৩ জনকে উদ্ধার করার গল্পটিও মিথ্যা। জঙ্গিরা যাদের হত্যা করেনি বরং সকালবেলা ছেড়ে দেওয়া হয়েছে সেই মানুষগুলোকে সামনে রেখেই বলছে সেনা বাহিনী তাদের উদ্ধার করে!

যে পরিবারটি কে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে সেই পরিবার সম্পর্কে পত্রিকা বলছে- “রাতভর আটক থাকার পর সকাল ৮টার দিকে কমান্ডো অভিযানে হাসনাতের পরিবার উদ্ধার পায় বলে জানান তার মা। সন্তান, পুত্রবধূ ও নাতনীদের জন্য স্বামী এম আর করিমকে সঙ্গে নিয়ে সারারাত গুলশানে ছিলেন তিনি।”

অথচ আমরা এক কোরিয়ান ভদ্রলোকের ভিডিওতে দেখছি অভিযানের আগেই বেঁচে যাওয়া মানুষগুলোকেও জঙ্গিরাই ছেড়ে দেয়। কোরিয়ান ভদ্রলোক তার বাসা থেকে ভিডিও করেছিলেন। এই ভিডিও যদি আমরা না দেখতাম তাহলে সেনা বাহিনীর মিথ্যা সাফল্যের গল্প আমাদের সারা জীবন বিশ্বাস করতাম।

প্রেস বিফিং এ নিহত ছয়জনকে জঙ্গি হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। যদিও জীবিত ফেরত আসা একজন বলছেন; হামলাকারী ছিল মোট ৫জন। আইএস ৫জন জিহাদীর ছবিও প্রকাশ করে। সুতরাং বাকি একজন কে তা নিয়ে প্রশ্ন এসেই যায়। ৫ জনের সাথে রেস্টুরেন্টের শেফকেও জঙ্গি হিসেবে সেনা বাহিনী পরিচয় করিয়ে দিচ্ছেন। শেফ হয়তো অভিযানে নিহত হয়েছেন। যতক্ষণ পর্যন্ত শেফের সাথে জঙ্গি কোন কানেকশন প্রমাণ করা সম্ভব হবে না ততোক্ষণ পর্যন্ত একজন সাধারণ মানুষকে জঙ্গি হিসেবে পরিচয় করিয়ে দেওয়া অপরাধ, যিনি কিনা গুলশান হামলায় নিরীহ নিহতদেরই একজন।

13563500_10209776180981026_966688820_n

৫ জঙ্গি

গত তিন বছরেও কানাডা প্রবাসী তামিম চৌধুরী কোন ছবি কোন তথ্য আমাদের পুলিশ বাহিনী দিতে পারেননি। যদিও পুলিশ বাহিনী নিজেরাই স্বীকার করেছেন যে তামিম চৌধুরী দেশে বসেই জঙ্গিবাদের নেতৃত্ব দিচ্ছেন। অন্যদিকে ২০১১ সালে সেনা বাহিনী থেকে বিতাড়িত মেজর জিয়া এই হামলার মূল পরিকল্পনাকারীদের একজন বলেও প্রেস বিফিং বিবৃতি দিয়েছে পুলিশ। দেশে বসে এই মেজর জিয়া একের পর এক জঙ্গি হামলার নেতৃত্ব দিয়ে আসলেও এখন পর্যন্ত পুলিশ কিংবা গোয়েন্দা সংস্থা জিয়াকে খুঁজে বের করতে পারেনি। এছাড়া আসলে মোট কতজন আক্রমণে অংশগ্রহণ করেছে তার প্রমাণ পাওয়া যাবে বেঁচে যাওয়া ১৩ জনের বক্তব্যের মাধ্যমেই। বলা যায় না বেঁচে যাওয়ার ১৩ জনের মধ্যেও জঙ্গিদের সহায়তাকারী কেউ থাকতে পারে। তবে সব কিছু সঠিক অনুসন্ধানের মাধ্যমেই আসলে জানা সম্ভব। এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য হল আক্রমণকারী জঙ্গিদের মধ্যেও নর্থ সাউথের শিক্ষার্থী ছিল। আসিফ মহিউদ্দিনের উপর হামলা, রাজীব হায়দারকে জবাই করা থেকে ব্লগার হত্যায় নর্থ-সাউথ শিক্ষার্থীদের নাম প্রতিবারই এসেছে। এমনকি প্রকাশক দীপন হত্যা ঘটনায়ও এই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের নাম আসে। আমেরিকায় বোমা হামলা করতে গিয়ে এফবিআই-এর ফাঁদে পড়ে যাওয়া নাফিজও ছিল এই বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র। ব্লগার হত্যাকারীর পরিকল্পনাকারী ফেরারী রানাও এই বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র যে কিনা রাজীব হত্যা মামলার প্রধান আসামী।

এছাড়া হামলার ১০ ঘণ্টা আগে আনসার বাংলা টুইট করে জানিয় দেয় এ গুলশানের কূটনৈতিক পাড়ায় তারা হামলা করবে। অথচ আমাদের আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এর কোন কিছুই দেখেনি কিংবা তারা ঈদ আনন্দে ব্যস্ত ছিলেন। যদিও হামলার পর তারা টুইটটি মুছে দেয়।

13598918_255163414863954_11162539_n

গুলশান রেস্টুরেন্ট হামলায় ১৭ জন বিদেশী, ৩ জন বাংলাদেশী খুন হোন। বিভিন্ন গণমাধ্যম বলছে যে, নিহতদের মধ্যে ফারাজ হোসেন বেঁচে যাওয়ার সুযোগ পেয়েছিলেন। জঙ্গিরা তাকে ছেড়ে দিতে চাইলেও তিনি তার দুই বিদেশী বন্ধুকে ফেলে কিছুতেই যেতে রাজি হোননি। রাতের বেলা রেস্টুরেন্ট হামলার শুরুতেই জঙ্গিদের আক্রমণে ২ জন পুলিশ অফিসার প্রাণ হারায় এবং ২০ জনের বেশি পুলিশ সদস্য আহত হয়। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশের পর সেনা বাহিনীর অপারেশন শুরু করে সকাল ৭টা ৪০ মিনিটে অর্থাৎ জঙ্গিরা রেস্তোরাঁয় সবাইকে বন্দি করার ১০ ঘণ্টা পর। সেনা বাহিনীর অভিযান ১৩ মিনিটেই শেষ হয়। এই তের মিনিটে সেনা বাহিনীর সাফল্য ১ জনকে গ্রেফতার। অভিযানে ৫ জন জঙ্গির সাথে রেস্তোরায় শেফ নিহত হয়। গ্রেফতার হওয়া ব্যক্তি রেস্টুরেন্টের কর্মচারী বলে তার স্বজনদের দাবী।

13595507_10209780881378533_1402689826_n

সবচেয়ে বেদনাদায়ক বিষয় হচ্ছে নিহতদের মধ্যে ইতালিয় এক নারী ছিলেন গর্ভবতী। গত এক বছর ধরে প্রধানমন্ত্রীর ভাষায় ‘টুকটাক’ হত্যা হলেও এবং হত্যার পর নিহতদের উপর দোষ চাপানোর অভ্যাস থাকলেও গুলশান হামলায় প্রধানমন্ত্রী থেকে শুরু করে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী নিহতদের উপর দোষ চাপানোর কোন সুযোগ পান নাই। শুরু থেকেই জঙ্গিদের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিয়ে তাদের মূল হোতাদের যদি খুঁজে বের করা সম্ভব হতো তাহলে হয়তো মৃত্যুর মিছিল কিছুটা থামানো সম্ভব হতো।

এরকম জিম্মি পরিস্থিতি বাংলাদেশে এই প্রথম। এমন পরিস্থিতিতে জিম্মিদের উদ্ধার করা বেশ কঠিনও বটে। কারণ যারা জিম্মি করে তারা মারতে এবং মরতেই সেখানে যায়। জঙ্গিরা ১৩জনকে ছেড়ে না দিয়ে হত্যা করলেও সেনা বাহিনী কিংবা আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর বিশেষ কিছু করার ছিল না। যেমনটি করার ছিল না রাতেই খুন হওয়া ২০ জনের সময়। আমেরিকায় অরল্যান্ডোর পালস নৈশক্লাবে গুলিবর্ষণের ঘটনায়ও আমেরিকার পুলিশ কিছু করতে পারেনি। কিন্তু সত্য সবসময় সত্য। উদ্ধার হওয়া নাগরিকদের কাউকে সেনা বাহিনী উদ্ধার করতে পারেনি বরং জঙ্গিরা ছেড়ে দিয়েছে বলেই প্রাণে বেঁচে যায় এটি বললে সেনা বাহিনীর অভিযানের কোন সম্মানহানি হয় বলে মনে হয় না। আইন শৃঙ্খলা বাহিনী ও সেনা বাহিনী তারা তাদের ক্ষমতার সবটুকু প্রয়োগ করেও কাউকে বাঁচাতে সক্ষম হয়নি, এটি তাদের নিজেদের ব্যর্থতা নয় তবে এটাই বাস্তবতা।

যে কোন হত্যাকাণ্ড ঘটে যাওয়ার পরের বিষয়টি হল মূল আসামীদের আবিষ্কার করা ও গ্রেফতার করা। ২০০৮ সালে মুম্বাই হামলার ঘটনায় কারা অস্ত্র দিয়েছে কারা পৃষ্ঠপোষকতা করেছে তার সব সূত্র ভারতীয় গোয়েন্দারা বাহির করতে সক্ষম হয়েছে। বাংলাদেশের আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কী পারবে কারা এই হামলার মূল পরিকল্পনাকারী কারা অর্থ ও অস্ত্র দিয়ে এসব জঙ্গিদের হামলা করতে পাঠাচ্ছে। এদের মূল শেকড় কী আবিষ্কার করতে সক্ষম হবে? সময়ই এসব উত্তর বলে দেবে।

সবচেয়ে নোংরা যে বিষয়টি শুরু হয়েছে তাহলো; আমাদের নীতিহীন রাজনৈতিক দলগুলো বরাবরের মতন দোষারোপের নোংরা রাজনীতি শুরু করে দিয়েছে। আর এতে এগিয়ে আসছে তাদের নিজেদের পোষা বুদ্ধিজীবীরা। তথ্য প্রমাণ ছাড়া দোষারোপ রাজনীতি করার অর্থ হল মূল বিষয় থেকে চোখ সরিয়ে নেওয়া। ৫ জঙ্গির মধ্যে রোহান ইমতিয়াজ যার বাবা কিনা আওয়ামী লীগ নেতা! অথচ পুলিশ জঙ্গি রোহানের ছবি না দিয়ে বাবুর্চি সাইফুলের ছবি ছেপে দিচ্ছি সরকার। এতো গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়ে নোংরা রাজনীতি ও রাজনৈতিক দলের নেতার ছেলের নাম থাকায় একজন সাধারণ ভিকটিমকে যেখানে জঙ্গি হিসেবে পরিচয় করিয়ে দিচ্ছে তাহলে প্রশ্ন আসে সরকারের আন্তরিকতা ও সিরিয়াসনেস আসলে কতোটুকু? সাধারণ মানুষ তো দূরের কথা ভবিষ্যতে তদন্তে আওয়ামী লীগের নেতা, কর্মীদের মনেই প্রশ্নের জন্ম দেবে। কোরিয়ান ভদ্রলোকের ভিডিও কারণে ইতোমধ্যে সেনা বাহিনীর সাফল্যের গল্পে পানি ঢেলে গেছে ভবিষ্যতে তাদের তদন্তে ব্যক্তি কিংবা গোষ্ঠী স্বার্থ যে থাকবে না তার জন্যে সরকারের উপর আমরা কতোটুকু আস্থা রাখতে পারি?

 

Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s